Anahata Chakra

অনাহত চক্র

স্বতঃস্ফূর্ত ভালবাসা এবং নির্ভীকতা

মানব ভ্রূণ গঠনের প্রাথমিক পর্যায়ে, শাশ্বত ও সর্বব্যাপী আত্মা প্রথমে আমাদের মস্তিষ্কে প্রবেশ করে। শ্রী মাতাজী এই মুহূর্তটিকে প্রথম হৃদস্পন্দন হিসাবে বর্ণনা করেছেন যা আমাদের মধ্যে প্রথমবার প্রাণশক্তিকে সঞ্চালিত করে এবং বিভিন্ন ঘটনার শৃঙ্খল সৃষ্টি করে যার ফলস্বরূপ কুণ্ডলিনী আমাদের স্থূল শরীরের ক্রমবর্ধমান বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে সূক্ষ্ম শরীর আমাদের মধ্যে প্রস্থাপিত করেন। এই স্পন্দিত শক্তি যা ভ্রূণের মাথার কাছে তৈরী হতে থাকে, তা-ই পরে আমাদের শরীরের বিকাশের সাথে সাথে , বুকের মধ্যে নেমে আসে। অতঃপর আমাদের আত্মা এই হৃৎপিণ্ডে, আমাদের জীবনের কোনও ঘটনা দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে, স্থায়ীভাবে একজন দর্শকের মতন আমাদের জীবনের প্রতিটি খেলাকে প্রত্যক্ষ করে।

যখন কুণ্ডলিনী হৃদয় চক্র বা অনাহত চক্রকে আলোকিত করে, তখন আমরা নির্বার্য প্রেম অনুভব করি, যা আমাদের আত্মার আসল প্রকৃতি। আমাদের চেতনা ভবসাগরের মায়ার জাল থেকে বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করে এবং আমরা আমাদের জাগতিক জীবনের ক্ষুদ্র ও তুচ্ছ আকাঙ্খা গুলির প্রতি উদাসীন হয়ে পড়ি । এই মায়ার বিভ্রান্তি থেকে বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গেই আমরা সম্পূর্ণ রূপে নির্ভয়ে জীবন যাপন করতে শুরু করি।

একটি বিশুদ্ধ হৃদয় থেকেই করুনা এবং ভালবাসার প্রকাশ ঘটে, এবং হৃদয় চক্রই হল সেই চক্র যা আমাদের দায়িত্ববোধ এবং অন্যের প্রতি কল্যাণকর দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে। হৃদয় চক্র আমাদের সম্পূর্ণ নিরাপত্তা এবং আত্মবিশ্বাস দেয়। এই ধরনের ব্যক্তিরা জীবনের অভীষ্ট লক্ষ্যপূরণে স্পষ্ট এবং দূরদৃষ্টি সম্পন্ন হয়। এর একটি সর্বোত্তম উদাহরণ হলেন মহাত্মা গান্ধীজী, ভারতের স্বাধীনতায় যাঁর নিঃস্বার্থ প্রচেষ্টা এবং অবদান চিরস্মরণীয়।

অবস্থান:
অনাহত চক্র আমাদের স্টার্নাম হাড়ের পিছনে বুকের মাঝে অবস্থিত। এই চক্র, কার্ডিয়াক প্লেক্সাসের কার্যকারিতা নিয়ন্ত্রণ করে। অনাহত চক্রের অনুভূতি আমাদের উভয় হাতের কনিষ্ঠ আঙুলে অনুভব করা যায়।

রঙ:
অনাহত চক্রের রঙ লাল। এই চক্রের উপাদান হলো বায়ু তত্ত্ব।

অনাহত চক্রের গুণাবলী:
• নিঃশর্ত ভালবাসা
• করুণা
• আনন্দ
• আত্মবিশ্বাস
• নির্ভীক জীবন এবং নিরাপত্তা বোধ
• পিতা মাতার সঙ্গে সুসম্পর্ক

অনাহত চক্রের মৌলিক গুণ হল নিঃশর্ত ভালবাসা। আত্ম-উপলব্ধির পরে এই চক্রের সক্রিয়তা আমাদের আত্মবিশ্বাসী, নৈতিকভাবে দায়িত্বশীল এবং মানসিক সুরক্ষাবোধ দেয়। যখন এই সূক্ষ্ম কেন্দ্রের গুণাবলী আমাদের মধ্যে প্রকাশ পায়, তখন আমরা অস্তিত্বের বিশুদ্ধ আনন্দ অনুভব করি। আমরা আধ্যাত্মিক সচেতনতার উচ্চতর অবস্থায় বিবর্তিত হওয়ার জন্য সর্বদা চেষ্টা করি।

অভিজ্ঞতা এবং সুবিধা:
অনাহত চক্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল আপনার হৃদয় এবং ফুসফুসকে নিয়ন্ত্রণে রাখা । এই অঙ্গগুলি আমাদের রক্ত সংবহন এবং শ্বাসযন্ত্রের স্বাস্থ্যকে নিয়ন্ত্রণ করে, যাদের সঠিক কার্যকারিতা মানব জীবনের জন্য অপরিহার্য। অনাহত চক্র স্তন এবং থাইমাস গ্রন্থি কেও নিয়ন্ত্রণ করে। থাইমাস গ্রন্থি হল একটি ছোট গ্রন্থি যা আপনার স্তনের হাড়ের উপরের অংশের পিছনে দিকে অবস্থিত। এটি আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতার কার্যকারিতার জন্য অপরিহার্য।

কখনও কখনও, আমরা প্রেম এবং করুণাকে, আমাদের অধিকারবোধ এবং স্বার্থপরতার অবান্তর অনুভূতির সাথে গুলিয়ে ফেলি। যেহেতু, সহজ যোগ আমাদের হৃদয়কে ঐশ্বরিক শক্তি দিয়ে পরিপূর্ণ করে, তাই আমরা এই পার্থক্য বুঝতে সক্ষম হই , আমরা অন্যদের প্রয়োজন সম্পর্কে আরও সচেতন হই । আমরা মোহ এবং স্বার্থপরতা ছাড়া প্রেম করতে সক্ষম হই।

অন্যান্য সব চক্রের মতোই, দৈনন্দিন জীবনের চাপ, আমাদের ভারসাম্যহীনতার দিকে নিয়ে যেতে পারে। অতিরিক্ত চিন্তা, অত্যধিক পরিকল্পনা, নিরাপত্তাহীনতা এবং উদ্বেগ সবই আমাদের অনাহত চক্রকে ভারসাম্যহীন করে তুলতে পারে। কিন্তু, যখন ধ্যানের মাধ্যমে এই চক্র শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তখন আমরা ভারসাম্য ফিরে পাই। আমরা আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠি ও নিরাপদ বোধ করি এবং সকল নেতিবাচক প্রভাব থেকে মুক্ত হই। যখন হৃদয় চক্র শক্তিশালী হয়, তখন আমরা জীবনের আনন্দকে সম্পূর্ণরূপে উপলব্ধি করতে পারি।

যদি আমাদের মাতা- পিতার সাথে নেতিবাচক সম্পর্কের অভিজ্ঞতা থেকে থাকে , তাহলে অনাহত চক্রকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে আপনি নিজেকে সংশোধন করতে পারেন। আপনি শ্রী রামের ন্যায় সদাচারী ও শিষ্টাচারী হয়ে ওঠেন । ফলস্বরূপ, আপনার সকলের সাথে সমস্ত সম্পর্ক উন্নত হয়।

স্ব-মূল্যায়ন:
যদি আপনার অনাহত চক্র বাধাগ্রস্ত বা ভারসাম্যহীন থাকে, তবে আপনার মধ্যে মানসিক অস্থিরতা, হাঁপানি এবং দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ইত্যাদি লক্ষণ অনুভব হয় । এই চক্র বেশি বাধাগ্রস্ত হলে , হার্ট অ্যাটাক, স্তন ক্যান্সার এবং ফুসফুসের রোগ হতে পারে। ধ্যানের মাধ্যমে এই চক্রটি পরিশুদ্ধ হলে সকল গুরুতর রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

বাধা ও ভারসাম্যহীনতার কারণ:

  • ভয়
  • অতিরিক্ত দায়িত্ববোধ/দায়িত্ববোধের অভাব
  • স্বার্থপরতা

কিভাবে ভারসাম্য বজায় রাখবেন:
আপনি যদি আপনার অনাহত চক্রের ভারসাম্য বজায় রাখতে চান তবে কয়েক সেকেন্ড গভীরভাবে এবং আস্তে আস্তে শ্বাস নিন। আপনি শ্বাস-নেওয়া এবং ছাড়ার মধ্যে নিজেকে শিথিল করুন । প্রথমে একটি গভীর শ্বাস নিন এবং কয়েক সেকেন্ডের জন্য এটি ধরে রাখুন; ধীরে ধীরে এবং মসৃণভাবে তারপর শ্বাস ছাড়ুন। প্রক্রিয়াটি কয়েকবার পুনরাবৃত্তি করুন।

আপনার অনাহত চক্রের ডান, বাম এবং মধ্য ভাগকে ভারসাম্যে আনতে নিম্নলিখিত পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। ধ্যানে বসে যখন আপনি হাতে চৈতন্য অনুভব করবেন, তখন হাতকে বুকের কয়েক ইঞ্চি উপরে রেখে ঘড়ির কাঁটার দিকে ঘোরান । এটি বেশ কয়েকবার পুনরাবৃত্তি করুন।

ধ্যান করার সময় আপনার ডান হাতের তালু আপনার হৃদয়ের উপরে রেখে বাম অনাহত চক্রকে ভারসাম্যে আনতে পারেন। এই সময় মনে মনে কয়েকবার বলুন: "আমি শুদ্ধ আত্মা" এবং শব্দগুলি আপনার হৃদয়ে অনুভব করুন।