সহজ যোগ ধ্যান
অন্তঃস্থিত নীরবতার শক্তি
ধ্যান এমন একটি শব্দ, যাকে নানা ভাবে ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে -কখনও তা গভীর চিন্তা বা মনন, আবার কখনও তা নিঃশব্দে চোখ বন্ধ করে মনকে একাগ্র করার প্রক্রিয়া।
সহজ যোগে ধ্যানের ভিত্তি আত্মসাক্ষাৎকারের উপর প্রতিষ্ঠিত, যেখানে সাধকের কুণ্ডলিনী (অন্তঃস্থিত ঐশ্বরিক শক্তি) জাগ্রত হয় এবং তাকে নির্বিচার সমাধির অবস্থায় নিয়ে যায়। এই অবস্থায় চিত্ত চিন্তা ও আবেগের সকল তরঙ্গ থেকে মুক্ত হয়ে এক শান্ত হ্রদের ন্যায় স্থির হয়ে যায় এবং নির্বিচার সচেতনতার [1a] অবস্থায় আত্মার আনন্দময় সত্তাকে উপলব্ধি করে।
যতবার কুণ্ডলিনী শক্তি জাগ্রত হয়ে মেরুদণ্ড দিয়ে উপরের দিকে ওঠে, ততবারই শরীরের চক্র ও নাড়ীগুলি শুদ্ধ হতে থাকে। তখন একজন সাধক সহজেই নিজের সূক্ষ্ম দেহযন্ত্রের স্থিতি অনুভব করতে পারেন। মাথার উপরের তালুতে ও হাতের তালুতে এবং কখনও সমগ্র শরীর জুড়ে এক শীতল বাতাসের অনুভূতি লাভ করা যায়। কয়েক সপ্তাহ নিয়মিত চর্চা করলেই সাধক তার নিজের ভিতরের শক্তি ও তার অবস্থার সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠেন। শুধু তাই নয়, চারপাশের পরিবেশে উপস্থিত ইতিবাচক অথবা নেতিবাচক শক্তির উপস্থিতি সম্পর্কেও সচেতন হয়ে ওঠেন। এমনকি আশেপাশে থাকা মানুষের সূক্ষ্ম দেহযন্ত্রের অবস্থাও তিনি অনুভব করতে পারেন।
সহজ যোগে ধ্যান করা খুবই সহজ – চাইলেই কেউ তা নিজের বাড়িতে বা কর্মস্থলে, একা বা সকলের সঙ্গে বসে করতে পারেন। শ্রী মাতাজী বারবার বলেছেন, আধ্যাত্মিক জাগরণের জন্য সমাজ বা পরিবার ছেড়ে কোথাও চলে যাওয়ার দরকার নেই। এই ধ্যান প্রক্রিয়ার মূল ভিত্তি হল সেই অন্তঃস্থিত শক্তির জাগরণ, যা প্রতিটি মানুষের মধ্যেই বিদ্যমান। এটি পুরোপুরি ব্যক্তির ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে যে, তিনি এই অভিজ্ঞতাটি গ্রহণ করতে এবং এর নিয়মিত অনুশীলন করতে চান কি না । এটি এক ধরনের সহজ ও স্বতঃস্ফূর্ত ধ্যানের অভিজ্ঞতা, যেখানে কোনও মানসিক কসরত বা জোর করে মনোসংযোগের বিষয় নেই।
অস্ট্রেলিয়া ও ভারতে পরিচালিত চিকিৎসা-সংক্রান্ত গবেষণায় দেখা গেছে, যখন কেউ চিন্তাশূন্য সচেতনতার অবস্থায় ধ্যানে স্থিত হন, তখন তার শরীরের নিজস্ব রোগ নিরাময়ক্ষমতা সক্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু কেবলমাত্র শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ, অথবা অন্য কোন যোগাভ্যাসের মাধ্যমে এই নিরাময় প্রক্রিয়া সক্রিয় হয় না।
অন্য কোন যোগাভ্যাস বা ধ্যানের পদ্ধতি মানসিক চাপ কিছুটা কমাতে কার্যকর হলেও, সেগুলোর কোনও পরিমাপযোগ্য চিকিৎসা-সংক্রান্ত ফলাফল দেখা যায়নি, অপর পক্ষে সহজ যোগ ধ্যানে তা বৈজ্ঞানিক ভাবে প্রমাণিত হয়েছে। [1b]
সহজ যোগ ধ্যানের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো,এটি আধ্যাত্মিকতার জন্য কোনও নির্দিষ্ট একটিই পথ নির্ধারণ করে না। এখানে না আছে খাদ্যাভ্যাসের কোনোও বাধা নিষেধ, না কোনও ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা। প্রত্যেকেই নিজের প্রয়োজন মতো ধ্যানের পথ বেছে নিতে পারেন কি গতিতে এগোবেন, কোন লক্ষ্য স্থির করবেন, সবই তাঁর নিজের সিদ্ধান্ত। প্রত্যেক মানুষ নিজের মত করে ধ্যানের আনন্দ উপভোগ করেন। এটি একটি জীবন্ত প্রক্রিয়া, যা ব্যক্তির প্রয়োজন ও পরিস্থিতি অনুযায়ী স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে কার্যান্বিত হয়। [2]
বিশ্বজুড়ে সহজ যোগ ধ্যানকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে ধ্যানের এই পদ্ধতি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে শেখানো হয়।
1a. ^ 1b. ^ ড. রমেশ মনোচা, ‘ Does Meditation Have a Specific Effect? : A Systematic Experimental Evaluation of a Mental Silence Orientated Definition' (নিউ সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়, অস্ট্রেলিয়া ২০০৮); e-book: ই-বুক: ‘Silence Your Mind’ প্রকাশিত: হ্যাচেট অস্ট্রেলিয়া, ২০১৩; Researching Meditation – The scientific study of meditation।
2. ^ নাইজেল টি. পাওয়েল, ‘Sahaja Yoga Meditation’, লন্ডন: করভালিস পাবলিশিং, ২০০৫।
