বিশ্বের জন্য একটি টাউন হল
যেখানে হৃদয়ের মিলন ঘটেছে
"ক্যাক্সটন হল", মধ্য লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার শহরে অবস্থিত। এটি উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে নির্মিত হয়েছিল এবং উইলিয়াম ক্যাক্সটনের সম্মানে এটার নামকরণ করা হয়েছিল, যিনি ইংল্যান্ডে প্রথম মুদ্রণযন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এটি ছিল এমন একটি আবিস্কার যা জ্ঞান লাভের ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটিয়েছিল। সাহসী ও নতুন চিন্তাধারার আদান-প্রদান ও অনুসন্ধানের কেন্দ্র হিসেবে এই স্থানের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।
প্রথমদিকে 'ক্যাক্সটন হল' ছিল একটি সরকারি ভবন—একটি টাউন হল। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি দ্বৈত ভূমিকা পালন করেছে। এখানে যেমন নাগরিক অনুষ্ঠান ও খ্যাতনামা ব্যক্তিদের বিবাহ সম্পন্ন হয়েছে, তেমনি অনুষ্ঠিত হয়েছে উচ্চকণ্ঠ সভা, সমাবেশ, আবেদনপত্র দাখিল এবং সামাজিক সংস্কার ও রাজনৈতিক আন্দোলনের আহ্বান। ক্যাক্সটন হলের দরজা থেকেই বিংশ শতাব্দীর বহু মহান ধারণা ও আন্দোলন বিশ্বমঞ্চে ছড়িয়ে পড়েছিল। নারীদের ভোটাধিকার আন্দোলন, সমাজতন্ত্র এবং দাসপ্রথার পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে অনুষ্ঠিত প্রথম প্যান-আফ্রিকান সম্মেলনের কণ্ঠস্বর—এসব তার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
তাই এটি সত্যিই তাৎপর্যপূর্ণ যে ১৯৭৭ সালে যখন শ্রী মাতাজী নির্মলা দেবী তাঁর বার্তা জনসমক্ষে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তিনি এই হলটিকেই বেছে নেন। ১৯৭৭ থেকে ১৯৮৩ সালের মধ্যে তিনি প্রায় একশতবার এই মঞ্চে বক্তব্য রাখেন,
যা ব্যাপক জনসাধারণের কাছে এক বিশেষ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তাঁর কথা ছিল সবার জন্য। আমন্ত্রণ ছিল উন্মুক্ত। প্রবেশ ছিল সম্পূর্ণ বিনামূল্যে।
মহান বাঙালি কবি ও নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৩ সালের গ্রীষ্মে এখানে ধারাবাহিকভাবে সফল বক্তৃতা প্রদান করেছিলেন। বক্তৃতাগুলোর শিরোনাম ছিল—
'মহাবিশ্বের সাথে ব্যক্তির সম্পর্ক', আত্মসচেতনতা’, ‘প্রেমে উপলব্ধি’ এবং ‘আত্ম-সমস্যা’। প্রায় সত্তর বছর পর শ্রী মাতাজিও সরাসরি এই বিষয়গুলোর ওপর আলোকপাত করেন। তাঁর পূর্বসূরির মতোই, তিনিও প্রাচ্যের এক প্রাচীন জ্ঞানকে পাশ্চাত্য শ্রোতাদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চেয়েছিলেন এবং তাদের নিজেদের অন্তর্জগতে এক আত্মঅন্বেষণের যাত্রায় নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন।
"আমাদের অন্তরে এমন এক সত্তা আছে, যেখানে স্থান ও কাল আর প্রভাব বিস্তার করতে পারে না, এবং যেখানে বিবর্তনের সব যোগসূত্র এসে এক জায়গায় মিলিত হয়।"
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শ্রী মাতাজীর ক্ষেত্রে তাঁর বক্তৃতার উদ্দেশ্য কেবল নতুন কোনো ধারণা অনুসন্ধান করা ছিল না, বরং সেই ধারণাকে বাস্তবে উপলব্ধি করানো ছিল। তাঁর বক্তৃতার সঙ্গে সবসময় একটি অতিরিক্ত উপহার যুক্ত থাকত।
সন্ধ্যার শেষে, তিনি সর্বদা সবাইকে তাঁর আত্ম-সাক্ষাৎকারের অভিজ্ঞতার কথা বলতেন। গভীর ধ্যানের নিমগ্নতায় তাদের পথ প্রদর্শিত করে, তিনি শ্রোতাদের নিজেদের অন্তর্গভীরতা অনুভব করার সুযোগ দিতেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "ব্রহ্ম-উপলব্ধি", শ্রী মাতাজীর "প্রকৃত সত্যের অভিজ্ঞতা" হয়ে উঠেছিল।
আবারও ক্যাক্সটন হলের সিঁড়ি থেকেই এক বিপ্লবী আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল। আধ্যাত্মিক স্তরে উত্থানের জন্য মানুষের ক্ষমতার একটি মৌলিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল এবং অনেকে নিজেদের মধ্যে গভীর পরিবর্তন এবং তাদের বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে এক নতুন রূপান্তর অনুভব করেছিলেন।
![]()
ছয় বছর ধরে শ্রী মাতাজী ক্যাক্সটন হলে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি সবার উদ্বেগ ও প্রশ্নের জন্য সময় দিয়েছেন। তিনি সেই বৃহৎ প্রশ্নগুলোর উত্তর দিয়েছেন—"আমরা এখানে কেন আছি?", "আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য কি?", ''ঈশ্বর আমাদের কেন সৃষ্টি করেছেন?", এমনকি "ঈশ্বর কি আদৌ আছেন?"- এসব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। এবং শেষে সবাইকে তাদের প্রকৃত সত্যের সাথে সংযোগ স্থাপনের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হতো।
এইভাবেই পাশ্চাত্যে শ্রী মাতাজীর প্রকাশ্য আধ্যাত্মিক কার্যক্রমের প্রকৃত সূচনা শুরু হয়েছিল। ক্যাক্সটন হলে সকলের জন্য ছিল উন্মুক্ত আমন্ত্রণ, এবং যা ছিল সর্বাধিক মূল্যবান—তা বিনামূল্যেই প্রদান করা হতো। যাঁরা তাদের আত্ম-সাক্ষাৎকার পেয়েছিলেন তারা অনেকেই শ্রী মাতাজীর পাশে থেকে গিয়েছেন এবং যতটা সম্ভব সত্যের অনুসন্ধানকারী লোকেদের কাছে পৌঁছাতে তাঁর প্রচেষ্টাকে সমর্থন করেছিলেন।
১৯৮০ সালে শ্রী মাতাজী নিজেই বলেছিলেন, ‘সত্যের অনুসন্ধান চলছে, আর বহু দোকান খুলেছে—যেখানে মানুষ সত্যের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। এটি কোনো দোকান নয়। এটি একটি মন্দির; আর বাজারের মাঝখানে থাকা মন্দিরের মূল্য খুবই সামান্য। যদি মন্দিরে পৌঁছাতে সাতটি পর্বত অতিক্রম করতে হয়, তবে তার মূল্য অনেক বেশি হয়। কিন্তু সেখানে খুব কম মানুষই জীবিত অবস্থায় পৌঁছাতে পারে। তাই মন্দিরকেই লন্ডনে, ক্যাক্সটন হলে নেমে আসতে হয়েছে, মানুষের সঙ্গে কথা বলার জন্য।
আত্মসাক্ষাৎকার প্রদানের অমূল্য দান হাতে নিয়ে শ্রী মাতাজী সকলকে সাদরে বরণ করতেন ও মাতৃস্নেহে আলিঙ্গন করতেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়, "ভালোবাসার মহান কর্তব্য হলো সকল সীমাবদ্ধতাকে সাদরে গ্রহণ করা এবং সেগুলিকে অতিক্রম করা"; এবং শ্রী মাতাজীর প্রেম এবং প্রেমের উপহার সকল বাধা অতিক্রম করে সমস্ত বিশ্ববাসীর হৃদয়কে আলোকিত করে।