পরম সত‍্য

পরম সত‍্য

১৫ই মার্চ, ১৯৯০ সালে অস্ট্রেলিয়ার সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মীয় অধ্যয়ন বিভাগের এক জনসভা থেকে উদ্ধৃতাংশ

একেবারে সূচনাতেই আমাদের একটি বিষয় জানা উচিত—সত্য যেমন, তেমনই থাকে। আমরা তাকে সংগঠিত করতে পারি না, তাকে কোনো নিয়মের মধ্যে বাঁধতে পারি না, এমনকি আমাদের মানবীয় বোধ দিয়ে তাকে সম্পূর্ণরূপে ধারণাও করতে পারি না। সত্য আছে, ছিল এবং থাকবে। সমস্ত ধর্মের সারকথা যদি এক লাইনে নামিয়ে আনা যায়, তবে তা হল—শাশ্বতকে অনুসন্ধান করো এবং ক্ষণস্থায়ী বিষয়কে তার প্রকৃত স্বরূপ বুঝে গ্রহণ করো।

shri-mataji-while-touring-india-1981-to-1982

প্রথম অংশটিই কঠিন—শাশ্বতকে অনুসন্ধান করা। শাশ্বতই সত্য, আর সত্য কী? এখন আমি যখন আপনাদের সঙ্গে কথা বলছি, তখন আপনারা সকলেই অত্যন্ত জ্ঞানী এবং সু-শিক্ষিত মানুষ। তাই আমি আপনাদের কাছে অনুরোধ করছি, আপনারা একটি উন্মুক্ত মন এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেখুন যে আমি যা বলছি তা সত্য কি না। নিজেরাই তা অনুভব করে দেখুন এবং এই সমস্ত কথাকে একটি অনুমান হিসেবে গ্রহণ করুন। আর যদি তা সত্য বলে প্রমাণিত হয়, তবে সততার সঙ্গে আমাদের তা গ্রহণ করতে হবে।

এখানে দুটি বিষয় আছে যা আমরা হয়তো গ্রহণ করতে চাই না, কিন্তু তবুও সেগুলি বিদ্যমান। তার একটি হল—এই সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ড, এই সমস্ত সৃষ্টি, ঈশ্বরের প্রেমের সর্বব্যাপী শক্তি দ্বারা পরিব্যাপ্ত, পুষ্ট এবং রক্ষিত। আধুনিক সময়ে এমনকি ঈশ্বরের নাম উচ্চারণ করাও অনেকের কাছে অতিরিক্ত বলে মনে হয়। সংস্কৃত ভাষায় একে পরম চৈতন্য বলা হয়, কোরানে একে রূহ বলা হয়েছে, আর বাইবেলে বলা হয়েছে ঈশ্বরের প্রেমের সর্বব্যাপী শক্তি বা ঈশ্বরীয় শক্তির সর্বব্যাপী প্রকাশ। আমরা যাকে আধ্যাত্মিকতা বা ঐশ্বরিকতা বলি, সেটিই তার সারতত্ত্ব। এটিই প্রথম সত্য।

এবং দ্বিতীয় সত্যটি হল—আমরা এই দেহ নই, এই মন নই, এই আবেগ নই, আমরা অহংকার নই, কিংবা এই চিন্তাধারাও নই। এর অতীতেই আমরা আত্মা, আমরা বিশুদ্ধ আত্মা। সমস্ত ধর্মেই এই দুইটি বিষয় বলা হয়েছে, তারা যেভাবেই তা প্রকাশ করে থাকুক না কেন।

প্রাচীন কালে যখন ভারতে অনুসন্ধান শুরু হয়েছিল—ভারতের কিছু বিশেষ সুবিধা ছিল অন্যান্য দেশের তুলনায়। প্রথমত, এখানকার আবহাওয়া এমন যে খুব বেশি কষ্ট ছাড়াই জঙ্গলে বসবাস করা যায়। পশ্চিমে আমরা বলতে পারি মানুষ যেন একটি গাছের মতো বাইরে দিকে প্রসারিত হতে শুরু করেছিল, আর ভারতীয়রা শুরু করেছিল নিজেদের শিকড়ের দিকে, অন্তরের গভীরে অনুসন্ধান করতে। এবং বহু আগে তারা আবিষ্কার করেছিল সহজ যোগ।

এটি কোনো আধুনিক বিষয় নয়; এটি ঐশ্বরিক শক্তির সঙ্গে একাত্মতা লাভ করার এক প্রাচীন ও স্বীকৃত পদ্ধতি, যা হল যোগ। সহজ অর্থ “জন্মগত”—‘সহ’ মানে “সঙ্গে” এবং ‘জ’ মানে “জন্ম।” অর্থাৎ আমাদের সঙ্গে জন্মগতভাবেই আছে ঐশ্বরিক শক্তির সঙ্গে সেই একাত্মতা লাভ করার অধিকার।

কিন্তু সহজ শব্দের আরেকটি অর্থ হল “স্বতঃস্ফূর্ত”, কারণ এটি সেই জীবন্ত শক্তি যা এই কার্য সম্পন্ন করে। আমাদের ভিতরে একটি জীবন্ত শক্তি আছে, যা অ্যামিবার স্তর থেকে আমাদের মানুষে পরিণত করেছে। আর এখন আরেকটি অবশিষ্ট শক্তি আছে, যা আমাদের ঐশ্বরিকের সঙ্গে সংযুক্ত করবে। এটিই যোগ শব্দের প্রকৃত অর্থ। এবং প্রত্যেক মানুষেরই সেই সর্বব্যাপী শক্তির সঙ্গে একাত্ম হওয়ার অধিকার আছে। সুতরাং এটিই আমাদের বিবর্তনের শেষ অগ্রগতি।

মানব স্তরে, আপনারা যেমন জানেন, আমরা একটি আপেক্ষিক জগতে বাস করি। কেউ বলেন এটি ভালো, আবার কেউ বলেন সেটি ভালো। এভাবে নানা মতভেদ ও সংঘর্ষ চলতেই থাকে। কিন্তু যদি তা পরম সত্য হয়, তবে তার সম্পর্কে দুই ধরনের মত থাকতে পারে না। তাই আমাদের বিনয়ের সঙ্গে স্বীকার করতে হবে যে আমরা এখনও সেই পরম সত্যে পৌঁছাইনি, যা ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণ করে, যা এই সর্বব্যাপী শক্তির অস্তিত্ব প্রমাণ করে, এবং যা মহান নবী ও মহান অবতারদের শিক্ষার সত্যতাকেও প্রমাণ করে।

অবশ্যই মানুষের প্রচেষ্টার কারণে ধর্মগুলি নানা বিচ্যুতি ও ভিন্নতার পথে চলে গেছে, এবং বাহ্যত তারা আলাদা বলে মনে হতে পারে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা ছিল জীবনের বৃক্ষের উপর বিভিন্ন সময়ে ফুটে ওঠা ফুলের মতো। সংস্কৃতে এর জন্য একটি শব্দ আছে—সময়াচার। সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের প্রকাশ ঘটেছিল, কিন্তু সবই একই জীবনের বৃক্ষের উপর সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু মানুষ সেই ফুলগুলো ছিঁড়ে নিয়ে বলতে শুরু করল, “এটা আমার, এটা আমার,” এবং সেই মৃত ফুলগুলোকে নিয়ে তারা লড়াই শুরু করল। এভাবেই আমরা আজকের সমস্যার উদ্ভব দেখতে পাই।

কোনো কিছুর জন্যই অন্ধ বিশ্বাসের প্রয়োজন নেই। অন্ধ বিশ্বাস উগ্রতার দিকে নিয়ে যায়। আপনার কখনোই অন্ধ বিশ্বাস রাখা উচিত নয়। আপনাকে তা অনুভব করতে হবে।

এই সাধু-সন্তদের মধ্যে কোনো ভুল ছিল না, নবীদের মধ্যেও কোনো ভুল ছিল না, এবং অবতারদের মধ্যেও কোনো ভুল ছিল না। তারা সকলেই আমাদের মঙ্গলের জন্য যা সর্বোত্তম ছিল তাই করেছেন এবং আমাদের বিবর্তনের প্রতিটি সময়ে আমাদের কী করা উচিত তা বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা ক্ষণস্থায়ী বিষয়গুলির সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন—যেন আমরা জীবনের ক্ষণস্থায়ী ভোগবিলাসে আসক্ত না হই, বরং শাশ্বতকে অনুসন্ধান করি…