আত্মা

আত্মা

আমাদের আত্মা শাশ্বত

আকাশের তারার মতোই আত্মা আমাদের ভিতরে জ্বলজ্বল করে।

মানব ভ্রূণ গঠনের প্রাথমিক পর্যায়ে, শাশ্বত ও সর্বব্যাপী আত্মা প্রথমে আমাদের মস্তিষ্কে প্রবেশ করে। শ্রী মাতাজী এই মুহূর্তটিকে প্রথম হৃদস্পন্দন হিসাবে বর্ণনা করেছেন যা আমাদের মধ্যে প্রথমবার প্রাণশক্তিকে সঞ্চালিত করে এবং বিভিন্ন ঘটনার শৃঙ্খল সৃষ্টি করে। এই স্পন্দিত শক্তি যা ভ্রূণের মাথার কাছে তৈরী হতে থাকে, তা-ই পরে আমাদের শরীরের বিকাশের সাথে সাথে , বুকের মধ্যে নেমে আসে। অতঃপর আমাদের আত্মা এই হৃৎপিণ্ডে, আমাদের জীবনের কোনও ঘটনা দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে, স্থায়ীভাবে একজন দর্শকের মতন আমাদের জীবনের প্রতিটি খেলাকে প্রত্যক্ষ করে।

যেখানে পশ্চিমে দর্শনশাস্ত্র মূলত ব্যক্তিত্ব,ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বা অহংকারের বিকাশের চারিদিকে ঘোরে, সেখানে পূর্বে দর্শন, সমষ্টিবাদের সাথে সম্পর্কিত এবং ব্যক্তিকে আমাদের সমষ্টিগত সত্ত্বা , সর্বব্যাপী আত্মার দিকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে।

Chakra Charts_BN_Page_05_Image_0001

শ্রী মাতাজী বর্ণনা করেছেন যে, কিভাবে জন্মের সময় নাভির নাড়ি কেটে দেওয়ার ফলে আমাদের সূক্ষ্ম দেহের সুষুম্না নাড়ীতে ঐশ্বরিক চেতনার সঙ্গে আমাদের চেতনার বিচ্ছেদ ঘটে। স্থূল (শারীরিক) স্তরে এই সুষুম্না নাড়ী, পরাসমবেদী স্নায়ুতন্ত্র (প্যারা-সিম্প্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম) রূপে প্রকাশিত হয়। এই স্নায়ুতন্ত্রের স্নায়ু বা নার্ভ সমূহের উৎপত্তি স্থল হল মস্তিষ্ক এবং সুষুম্না কাণ্ডের নিম্নভাগে সেক্রাল অংশ। এই দুটি ভাগের মধ্যবর্তী যে শূন্যস্থান তা হিন্দু শাস্ত্রে 'ভবসাগর' বা 'মায়া' বলে পরিচিত। জেন প্রথায় একে বলা হয় 'ভয়েড' (Void) ।
পরবর্তীকালে যখন শৈশবে, অহঙ্কার (ego) ও প্রতি-অহঙ্কার বা সংস্কার (superego) প্রকাশিত হয়, মস্তিষ্কের বাম ও ডান দিকে দুটি বেলুনের মতো আকার নিয়ে তখন তা আমাদের চেতনাকে একটি স্বতন্ত্র সত্তা হিসেবে সম্পূর্ণভাবে আচ্ছাদিত করে ফেলে এবং আমিত্ববোধের প্রকাশ ঘটায়।

আত্ম-সাক্ষাৎকার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যখন কুণ্ডলিনী শক্তি হৃদয়ে উঠে আসে, তখন এটি আত্মাকে আলোকিত করে এবং আমরা আত্মার সহজাত গুণ ও অস্তিত্বের শুদ্ধ আনন্দ, অনুভব করতে শুরু করি। যখন কুণ্ডলিনী আমাদের মাথার ব্রহ্ম রন্ধ্রের ঊর্ধে অবস্থিত, সর্বোচ্চ শক্তি কেন্দ্র সহস্রার চক্রের, কাছে পৌঁছায়, তখন আমাদের আত্মা, সর্বব্যাপী সর্বজনীন শক্তির সাথে একাকার হয়ে যায়, আর আমরা নিজেদের মধ্যে এই এক হওয়ার আনন্দকে উপভোগ করি। এমনকি এই আনন্দের একটি আভাস (আমরা বুঝতে পারি যখন কুণ্ডলিনীর মাত্র কয়েকটি স্ট্র্যান্ড আমাদের মাথার উপরে উঠে আসে) আমাদের আধ্যাত্মিক যাত্রায় একটি পথপ্রদর্শক তারকা হিসাবে কাজ করতে পারে। একবার আমরা সেই আনন্দ অনুভব করলে, আমরা এটি হারাতে চাই না এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে এমন মনোভাব এবং আচরণ থেকে বিরত থাকি যা এর রক্ষণাবেক্ষণ এবং বৃদ্ধির জন্য ক্ষতিকর। তাই, সহজ যোগে খুব কম নিয়ম আছে এবং তেমন কোন মতবাদ নেই।

GISELE_MOURA_HAF_10DEZ2022__14

তাহলে জানতে হবে যে আমরাই শান্তি, কারণ আত্মাই শান্তির উৎস। একবার আপনি আত্মা স্বরূপ হলে, আত্মা আপনার চিত্তে এসে যায় এবং আপনি খুব শান্ত হয়ে ওঠেন। আপনি যদি চাকার প্রান্তে (পেরিফেরিতে) বা পরিধিতে থাকেন তবে আপনি সর্বদা ঘূর্ণনের মধ্যে থাকবেন, কিন্তু চাকার কেন্দ্রটি একেবারে শান্ত। সুতরাং, যদি আপনি আপনার কেন্দ্রে ঝাঁপ দেন, তাহলে সেখান থেকে আপনি চাকার সমস্ত গতিবিধি দেখতে পাবেন, তবে আপনি যেহেতু কেন্দ্রে আছেন আপনি বিক্ষুব্ধ হবেন না। আপনি দেখতে পাবেন যে,পরিধির সমস্যাগুলিকে সমাধান করা খুব সহজ।

YouTube player

ভারতের বিখ্যাত আধ্যাত্মিক গুরুদের একজন আদি শঙ্করাচার্য, তাঁর "আত্মষ্টকম্" এর সুন্দর শ্লোকগুলিতে, আমাদের হৃদয়ে প্রতিফলিত সমষ্টিগত চেতনার এই পরম সচেতন অবস্থাকে চিরন্তন আনন্দ (অনন্ত আনন্দ বা নিত্য আনন্দ) হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

"মনোবুদ্ধ্যহংকার চিত্তানি নাহং, ন চ শ্রোত্রজিহ্বে ন চ ঘ্রাণনেত্রে।
ন চ ব্যোমভূমির্ন তেজো ন বায়ুঃ, চিদানন্দরূপঃ শিবোহম্ শিবোহম্।।১।।
আমি মন নই, বুদ্ধি নই, অহঙ্কার কিংবা চিত্তও নই,
আমি কর্ণ বা জিহ্বা নই,
ঘ্রাণেন্দ্রিয়, দর্শনেন্দ্রিয়, আকাশ,ভূমি,অগ্নি, বায়ু কিছুই নই।
আমি শাশ্বত পরমানন্দ এবং চেতনা, আমি শিব! আমি শিব!
"

সত্য এই যে, তুমি এই দেহ নও, তুমি এই বুদ্ধি নও, তুমি আবেগ নও, তুমি হলে আত্মা।