আত্মজাগরণের অভিজ্ঞতা

আত্মজাগরণের অভিজ্ঞতা

মানবজাতির প্রতি তাঁর সীমাহীন করুণা ও ভালোবাসা

একবার ইংল্যান্ডে এক সাংবাদিক জিজ্ঞাসা করেছিলেন,“আপনার জীবনে কি কোনো হতাশা এসেছে?”শ্রী মাতাজী উত্তরে বলেছিলেন "আমার না আছে কোনো আনন্দ, না আছে কোনো হতাশা।এরপর হাসিমুখে শ্রী মাতাজীর সাথে অনেক কথোপকথন শুরু হয়েছিল,তাঁর কথোপকথন প্রায়ই হাস্যরসপূর্ণ, ব্যতিক্রমধর্মী এবং অনেক সময় অপ্রত্যাশিত মোড় নিত।

শ্রী মাতাজী এর এমন এক অনন্য ক্ষমতা ছিল, যার মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে এমন সব গভীর সম্পর্ক উদ্ঘাটন করতেন, যা অধিকাংশ মানুষের দৃষ্টিগোচর হতো না। এই কারণেই তাঁর বক্তৃতা ও কাহিনিগুলি হয়ে উঠত আকর্ষণীয়, মনোমুগ্ধকর ও স্মরণীয়।তিনি এ ধরনের হাজার হাজার বক্তৃতা প্রদান করেছেন—যা সর্বদা শিক্ষামূলক এবং সর্বদা প্রজ্ঞা-উদ্দীপক ছিল। তাঁর বর্ধিত পাসপোর্ট প্রায় এক ইঞ্চি পুরু ছিল এবং তাতে সারা বিশ্বের নানা স্থানের সিলমোহর অঙ্কিত ছিল। সমগ্র বিশ্ব পরিভ্রমণের পেছনে তাঁর একটিই স্থির ও অবিচল উদ্দেশ্য ছিল—যত বেশি সম্ভব মানুষের কাছে পৌঁছে তাঁদের আত্ম-সাক্ষাৎকার প্রদান করা।

তিনি হাজার হাজার মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন, তবে তা ছিল না কেবল সংক্ষিপ্ত শুভেচ্ছা ও বিদায়ের ধারাবাহিকতা।নিজের সামনে উপস্থিত ব্যক্তির সঙ্গে তিনি গভীরভাবে একাত্ম হয়ে যেতেন,সে ব্যক্তি জগত-অভিজ্ঞ ও কৃতী হোক, অথবা একজন সরল গ্রামবাসীই হোক না কেন।শ্রী মাতাজী মানুষের অন্তরের গভীরে প্রবেশ করতেন, কারণ তাঁর কাছে প্রত্যেক মানুষই গুরুত্বপূর্ণ ছিল, প্রত্যেকের মধ্যেই অসীম সম্ভাবনা দেখতেন।

এই সম্ভাবনাই শ্রী মাতাজী কে তাঁর কাজ করতে অনুপ্রাণিত করেছিল।প্রত্যেক মানুষের আত্মস্বরূপে জাগ্রত হওয়ার শক্তি, অন্তরের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার সামর্থ্য এবং আত্মসাক্ষাৎকার লাভের যোগ্যতা আছে।কেউ কেউ তাঁকে চিনতে পেরেছিলেন, আবার কেউ একেবারেই পারেননি।এটি নির্ভর করত ব্যক্তির নিজস্ব অন্তর্দশা ও আত্মিক অবস্থানের উপর—তারা নিজেদের অন্তরে কোথায় অবস্থান করছিল তার উপর; তিনি কে ছিলেন তার উপর নয়।কেউ তাঁকে দেখেছিলেন, অনুভব করেছিলেন এবং তাঁর দিকে আকৃষ্ট হয়ে এগিয়ে এসেছিলেন;আবার কেউ কেউ মুখ ফিরিয়ে দূরে সরে গিয়েছিলেন…

আর শ্রী মাতাজী কে ছিলেন?তাঁর প্রকৃত স্বরূপই বা কী ?
শ্রী মাতাজী ছিলেন এক জন গুরু।আর গুরু বলতে কী বোঝায়? — ‘গুরু’ শব্দটির একটি অত্যন্ত নির্দিষ্ট অর্থ রয়েছে:‘গু’ অর্থ অজ্ঞতা,‘রু’ অর্থ অপসারণকারী বা দূরকারী।অতএব, গুরু সেই ব্যক্তি, যিনি মানুষের অস্তিত্বকে আচ্ছন্ন করে রাখা আধ্যাত্মিক অজ্ঞতা ও মায়াজাল দূর করতে সক্ষম হন।

যাঁরা তাঁর সান্নিধ্যে এগিয়ে এসেছিলেন, তাঁদের অনেকেই অনুভব করেছিলেন যে শ্রী মাতাজী সত্যিই এক পরিপূর্ণ ও সত্যস্বরূপ ব্যক্তিত্ব সমস্ত কিছুর কেন্দ্রবিন্দু, এক দিব্য জননী।কোনো এক গভীর স্বাভাবিক ক্ষমতাবলে তিনি মানুষকে নিজের সমস্যার মুখোমুখি হতে এবং সেগুলোর সমাধান নিজেই খুঁজে নিতে সহায়তা করতেন। তাঁর কার্যপদ্ধতি ছিল এক স্নেহময় উদ্যানপালকের মতো যিনি ধীরে ধীরে বীজ অঙ্কুরিত করে তাকে ফুলে-ফলে বিকশিত হতে সাহায্য করেন; ঠিক তেমনই তিনি একজন মানুষের অন্তর্নিহিত সম্ভাবনাকে প্রস্ফুটিত ও পরিণত করে তুলতেন।

“প্রজ্ঞা উজ্জ্বল ও অবিনশ্বর,
যারা তাকে ভালোবাসে, তাদের কাছে সে সহজেই প্রকাশিত হয়;
যারা তাকে অনুসন্ধান করে, তারা তাকে খুঁজে পায়।
যারা তাকে কামনা করে, তাদের কাছে সে নিজেকে দ্রুত পরিচিত করে তোলে।
… সে নিজেই তাদের সন্ধানে বের হয়, যারা তার যোগ্য,
এবং তাদের পথেই সে অনুগ্রহপূর্বক আবির্ভূত হয়।”
Wisdom of Solomon, অধ্যায় ৬, পদ ১২–১৭

তবু তাঁর বাণী ছিল দৃঢ় ও স্পষ্ট “ নিজেই নিজের গুরু হয়ে ওঠো, আত্মরূপে প্রতিষ্ঠিত হও।” কিন্তু বাস্তবে তা অনেক সময় কিছুটা কঠিন হয়ে উঠত। এর জন্য প্রয়োজন ছিল দৃঢ় সংকল্প ও নিয়মিত আত্মশাসন।

দুর্বল ও বিচ্ছিন্ন মনোযোগ, বিভ্রান্তি, আলস্য, আত্মসম্মানের অভাব এবং এ রকম অগণিত সমস্যাই প্রত্যেক ব্যক্তির নিজের ওপর কাজ করার ক্ষমতা ও দৃঢ়সংকল্পকে ব্যাহত করত—নিজেকে সঠিকভাবে গড়ে তোলা, নিজের যত্ন নেওয়া এবং নিজের সম্পূর্ণ সম্ভাবনাকে উপলব্ধি করার পথে এগোতে বাধা সৃষ্টি করত।

এই প্রক্রিয়ায়, গুরুরূপে শ্রী মাতাজী কখনও বাঘের ন্যায় তেজস্বিনী ও প্রখর হয়ে উঠতেন—যাঁকে দেখে গভীর শ্রদ্ধা ও বিস্ময় জাগত। আবার মাতৃরূপে তিনি হতেন অত্যন্ত স্নিগ্ধ, ধৈর্যশীলা ও সান্ত্বনাদাত্রী।
মায়ের স্নেহে তিনি মানুষকে অনুপ্রাণিত ও উন্নত করে তোলার জন্য সদা চেষ্টায় থাকতেন। কেউ যখন দ্বিধাগ্রস্ত বা বিপথগামী হয়ে পড়ত, তখনও তিনি সস্নেহে হাত বাড়িয়ে তাকে পুনরায় সঠিক পথে পরিচালিত করতে প্রস্তুত থাকতেন।

তুমি যখন তাঁর স্নেহময় দৃষ্টির মধ্যে থাকতে, তখন মনে হতো যেন স্বয়ং বিবর্তনের হাতেই নিজেকে সমর্পণ করেছ। তাঁর হাসি সান্ত্বনা দিত, অন্তরকে মুক্তি ও পুনরুদ্ধারের অনুভূতিতে ভরিয়ে তুলত। তাঁর কণ্ঠস্বর আশ্রয়, সহায়তা ও উপদেশ এনে দিত।তবুও সিদ্ধান্তটি সবসময় ব্যক্তির নিজের হৃদয়ের মধ্যেই থাকত তিনি তাঁর বাণী অনুসরণ করবেন কি না। উপলব্ধির ভিন্ন ভিন্ন স্তরে, প্রত্যেকে শ্রী মাতাজীকে নিজের নিজস্ব উপায়ে অনুভব করতেন।

মানুষকে সামলানোর ক্ষেত্রে তাঁর সূক্ষ্মতা ছিল অপরিমেয়।ক্ষুরের মতো তীক্ষ্ণভাবে অত্যন্তনির্ভুলতার সঙ্গে তিনি মুহূর্তের মধ্যেই যে কোনো পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে সুরে বাঁধতে পারতেন।তাঁর মনোযোগ এমনভাবে ভেদ করে প্রবেশ করত যে, কী বলা হচ্ছে তা যেমন শুনতে পেতেন, তেমনি কী অব্যক্ত রয়ে গেছে—সেটিও তিনি অনুধাবন করতে পারতেন।

তাঁর হাসি শুনলেই অন্যের মুখেও হাসি ফুটে উঠত। তাঁর সাক্ষীভাবের শক্তি ছিল বিস্ময়কর, আর জীবনের উত্থান-পতনকে উপভোগ করার যে ক্ষমতা তাঁর ছিল, তা মানুষকে মুক্তির অনুভূতি দিত।শ্রী মাতাজী সম্পর্কে মানুষের স্মৃতিচারণে প্রায় সবার অনুভূতিই এক সুরে মিলে যায়—এক বিশেষ সৌভাগ্যের বোধ, শুভ নিয়তির অনুভব, কিংবা ঈশ্বরপ্রদত্ত আশীর্বাদের মতো এক গভীর কৃতজ্ঞতা; যে কোনোভাবে তারা শ্রী মাতাজী ও তাঁর শিক্ষার সংস্পর্শে আসতে পেরেছিলেন।

শ্রী মাতাজীর অন্তর্দৃষ্টি ও প্রজ্ঞার বাণী চিরকাল একই ও অবিচল থাকে—যেমন তিনি বলেছেন:

“আমি সকল সত্যসন্ধানীদের প্রতি প্রণাম জানাই।”
“তুমি হলে আত্মা।”
“তোমার অন্তরে এক শক্তি বিরাজমান।”
“তুমি নিজেই নিজের গুরু হয়ে ওঠো।”
“আনন্দ উপভোগ করো!”
“তুমি তোমার আত্মসাক্ষাৎকার লাভ করতে পারো। তুমি তোমার হাতের তালুতে এবং মাথার উপরে শীতল বাতাসের অনুভব করতে পারো।”

মূল বার্তাটি কখনোই পরিবর্তিত হয়নি। প্রশ্ন ছিল কেবল একটাই—কতজন সেই বাণী শুনবে এবং নিজের সত্যস্বরূপকে আবিষ্কার করার এই সুযোগ গ্রহণ করবে?

শ্রী মাতাজীর উত্তরাধিকার রয়ে গেছে তাঁদের মধ্যে, যারা তাঁর বাণী শুনেছেন, তাঁর এই উপহারকে হৃদয়ে ধারণ করেছেন এবং সহজযোগকে উপভোগ করে তা অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছেন।

তাঁর সত্তার স্পর্শ অনুভূত হয় আমাদের হাতের তালুতে এবং মাথার উপরে সেই শীতল সমীরণের মাধ্যমে। তাঁর কৃপা মৃদুভাবে আমাদের হৃদয়কে কোমল করে তোলে, আর দিব্য প্রেম আমাদের সমগ্র সত্তায় প্রতিধ্বনিত হয়।