শব্দকোষ
ধর্ম
পরিবেশতন্ত্র ও মানব বিবর্তনের স্থিতি ও ভারসাম্য রক্ষাকারী উপাদান হিসেবে সঠিক আচরণ বা ধার্মিকতার বিধান।
কুণ্ডলিনী
মেরুদণ্ডের নিম্নভাগে কুণ্ডলী পাকিয়ে অবস্থান করা এক সুপ্ত দৈবশক্তি। যখন এটি জাগ্রত হয়, তখন এই কল্যাণময় ও পোষণকারী শক্তি শরীরের স্নায়ু নাড়িকেন্দ্রগুলির মধ্য দিয়ে ঊর্ধ্বমুখে প্রবাহিত হয় এবং মস্তকের শীর্ষে অবস্থিত ফন্টানেল অস্থির অঞ্চলের মাধ্যমে বাইরে প্রকাশিত হয়। এই শক্তিকে মাথার উপরে এবং হাতের তালুতে শীতল বায়ু রূপে অনুভব করা যায়।
সহজ যোগ
সহজ শব্দের অর্থ “সহজাত” বা “আপনার সঙ্গে জন্মগ্রহণ করা”— এখানে সহ অর্থ “সঙ্গে” এবং জ অর্থ “জন্ম”।
শ্রী মাতাজী ব্যাখ্যা করেছেন—
“সহজের আর একটি অর্থ ‘স্বতঃস্ফূর্ত’, কারণ এটি সেই জীবন্ত শক্তি যা সবকিছু সম্পন্ন করে। আমাদের মধ্যে একটি জীবন্ত শক্তি আছে, যা অ্যামিবার স্তর থেকে আমাদেরকে মানুষে পরিণত করেছে। আর এখন আরেকটি অবশিষ্ট শক্তি রয়েছে, যা আমাদের ঐশ্বরিক শক্তির সঙ্গে সংযুক্ত করবে। এটাই ‘যোগ’ শব্দের প্রকৃত অর্থ। এবং প্রত্যেক মানুষের সেই সর্বব্যাপী শক্তির সঙ্গে একাত্ম হওয়ার অধিকার রয়েছে। সুতরাং এটিই আমাদের বিবর্তনের শেষ অগ্রগতি।”
সহজ যোগ ধ্যান
যে প্রক্রিয়া ‘আত্মসাক্ষাৎকার’-এর অভিজ্ঞতাকে স্থায়ী করে (অর্থাৎ কুণ্ডলিনী জাগরণ)। সহজ যোগের ধ্যানের মাধ্যমে মানুষ নিজের আত্মার সাথে সংযোগ স্থাপন করতে পারে এবং একই সঙ্গে নির্বিচার সচেতনতার অবস্থায় পৌঁছাতে পারে— এই দুই-ই ‘যোগ’ বা ‘আত্মা -পরমাত্মার মিলন’-এর প্রকৃত বাস্তবায়ন। নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে এই চিন্তাশূন্য সচেতনতার অবস্থাকে স্থিতিশীল করা যায় এবং আধ্যাত্মিক বিকাশ অর্জন করা সম্ভব।
সহস্রার
মাথার শীর্ষে ফন্টানেল অঞ্চলে অবস্থিত সপ্তম শক্তিকেন্দ্র। এই কেন্দ্রের মধ্য দিয়েই কুণ্ডলিনী শক্তি প্রবাহিত হয় এবং নির্বিচার সচেতনতার অবস্থা তৈরী করে।
স্বয়ং
আধ্যাত্মিকতার পরম্পরায় বলা হয় যে, আপনার মধ্যেই নিজের আত্মসাক্ষাৎকার লাভ করার এবং নিজের সত্য স্বরূপে পৌঁছানোর শক্তি নিহিত রয়েছে। শ্রী মাতাজী ব্যাখ্যা করেছেন যে সত্যটি হলো— আমরা এই শরীর নই, আমরা এই মন নই, আমরা এই অহং নই, আমরা এই সংস্কার বা শর্তাধীনতাও নই।
‘আত্মা’ হল আমাদের প্রত্যেকের অন্তরে অবস্থিত বিশুদ্ধ চেতনা। আত্মাই বিকিরণ করে। আত্মাই মহিমা প্রদান করে। আত্মাই প্রত্যেক মানুষের জীবনে নির্মল প্রেম, নিরাপত্তা এবং দৈব সহায়তার সমস্ত আশীর্বাদ প্রদান করে।
আত্ম-উপলব্ধি
ব্যক্তিগত চেতনার সঙ্গে আত্মা ও ঈশ্বরের স্বরূপের বিশুদ্ধ ও প্রত্যক্ষ সচেতনতার বাস্তব সংযোগ হলো আত্মসাক্ষাৎকার। এটি আধ্যাত্মিক বিবর্তনের শেষ বিন্দু নয়; বরং প্রকৃত অর্থে এক নতুন সূচনা।
আত্মসাক্ষাৎকার সমস্ত ভ্রান্ত পরিচয়ের সঙ্গে আসক্তি দূর করে মানুষের আধ্যাত্মিক বিকাশের পথ উন্মুক্ত করে, কুণ্ডলিনী শক্তিকে অবাধে প্রবাহিত হতে দেয় এবং ঐশ্বরিক শক্তির সঙ্গে সত্যিকারের সংযোগ স্থাপন করে। এর ফলে মানুষের অন্তর্নিহিত সমস্ত স্বয়ং-সংশোধনশীল শক্তি জাগ্রত হয়ে ওঠে।
আত্মা
প্রত্যেক মানুষের মধ্যে প্রতিফলিত ঐশ্বরিক সত্তা— সেটিই হল সত্য বা বিশুদ্ধ আত্মা। আত্মসাক্ষাৎকারের পর আত্মাকে আমাদের চেতনার মধ্যে উপলব্ধি ও অনুভব করা যায়।
সূক্ষ্ম তন্ত্র
সূক্ষ্ম তন্ত্র হলো শক্তিকেন্দ্র ও নাড়ি-সমূহের সেই সূক্ষ্ম ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে আপনার অন্তর্নিহিত শক্তি প্রবাহিত হয়। সহজ যোগের ধ্যান আপনাকে সূক্ষ্ম তন্ত্রকে অনুভব করতে, বুঝতে এবং দৈব শক্তিকে ব্যবহারিক জীবনে প্রয়োগ করতে শেখায়, যার মাধ্যমে স্বাস্থ্য, ভারসাম্য ও জীবনকে উন্নত করা যায়।
এই সমগ্র প্রক্রিয়ার সূচনা হয় আপনার অন্তর্নিহিত শক্তি— কুণ্ডলিনীর জাগরণের মাধ্যমে।
চিন্তাহীন সচেতনতা
এটি সচেতনতার এক উচ্চতর অবস্থা, যখন মন শান্ত কিন্তু সম্পূর্ণ সজাগ থাকে। অপ্রয়োজনীয় চিন্তা থেমে যায়, ফলে চিত্ত বর্তমান মুহূর্তে প্রতিষ্ঠিত হয়।
মানসিক চাপ ও ক্লান্তি অধিকাংশ সময় অতীত বা ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করার ফলেই সৃষ্টি হয়। যখন চিন্তা শান্ত হয়ে যায়, তখন আমাদের সূক্ষ্ম তন্ত্রের কল্যাণময়ী মাতৃশক্তি সক্রিয় হয়, যা আমাদের জীবনে পুনরায় শক্তি, ভারসাম্য ও সুস্বাস্থ্য ফিরিয়ে আনে।
পরম চৈতন্য
সমস্ত জীবিত সত্তা কণা ও তরঙ্গের সমন্বয়ে গঠিত, যা কোনো না কোনো ধরনের চৈতন্য বিকিরণ করে—তা ইতিবাচক হোক বা নেতিবাচক। ইতিবাচক পরম চৈতন্য কল্যাণকর ও পোষণকারী । আত্মসাক্ষাৎ লাভের পর দিব্য পরম চৈতন্য,শীতল প্রবাহ রূপে আমাদের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে (চক্রে), হাতের তালুতে এবং ব্রহ্মরন্ধ্রের উপরের অংশে অনুভব করা যায়। “পরম চৈতন্য আসলে ঈশ্বরীয় প্রেম ছাড়া আর কিছুই নয়।” শ্রী মাতাজী
যোগ
জনসাধারণের ধারণা অনুযায়ী যোগ কে শারীরিক ব্যায়াম বা আসন কে মনে করা হয়, কিন্তু আধ্যাত্মিকতায় যোগ কোনো ব্যায়াম বা বিভিন্ন আসনের সমষ্টিকে নির্দেশ করে না; বরং এর প্রকৃত অর্থ হলো ‘যুক্ত হওয়া’ বা ‘একাকার হওয়া’। যোগের একটি প্রাচীন উল্লেখ পাওয়া যায় পতঞ্জলির যোগসূত্রে, যা খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে ভারতে সংকলিত সংক্ষিপ্ত সূত্রসমূহের একটি সংকলন।