উত্তরাধিকার

একটি মহৎ উত্তরাধিকার

শালিবাহন রাজবংশের উত্তরাধিকারিনী

১৯২৩ সালের ২১শে মার্চ মহা বিষুব সংক্রান্তির তিথিতে ঠিক দুপুর বারোটায়, শ্রী নির্মলা সালভে ভারতবর্ষের ভৌগোলিক মানচিত্রের কেন্দ্রে অবস্থিত ছিন্দওয়াড়া শহরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। শ্রী নির্মলা দেবীর স্বভাবে ছোটবেলা থেকেই তাঁর পূর্বপুরুষদের মহৎ গুণাবলী গুলি লক্ষ্য করা যেত।

YouTube player

তাঁর ঠাকুমা , শ্রীমতী সাখুবাই সালভে, তাঁর সাহসী এবং ন্যায়পরায়ন গুণাবলী প্রদর্শন করেছিলেন, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পারিবারিক রাজবংশের ঐতিহ্য ছিল। ১৮৮৩ সালে, গর্ভাবস্থার শেষ পর্যায়ে, শ্রীমতী সখুবাই দেবী এক দুঃখজনক পরিস্থিতিতে তাঁর স্বামীকে হারান। তাঁর আত্মীয়দের দ্বারা ভীতপ্রদর্শিত হয়ে (যাঁরা এই সত্যটি মেনে নেননি , যে তিনি এবং তাঁর পরিজনবর্গ খ্রিস্টান ধর্ম অবলম্বন করেছিলেন ), তিনি তাঁর চার সন্তান সমূহদের নিয়ে অন্যত্র চলে যান এবং এক বর্ষা-সিক্ত গভীর রাতে পাশের এক জলস্ফীত নদী গর্ভে পতিত হন।

সাখুবাইয়ের তাঁর অটল বিশ্বাসবলে, নিজের শারীরিক অবস্থার তোয়াক্কা না করে, নয় গজের শাড়ি পরা অবস্থায়, ঝরঝরে বৃষ্টি আর ফুলে-ফেঁপে ওঠা নদী পেরিয়ে তিনি তাঁর সন্তানদের নিয়ে পার হতে পেরেছিলেন। এরপর তাঁদের নিকটতম রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছাতে আট কিলোমিটার হেঁটে যেতে হয়। ভোরবেলায় তাঁরা উজ্জয়নের উদ্দেশ্যে একটি ট্রেনে ওঠেন—সেখানে ছিল সাখুবাইয়ের ভাইয়ের বাড়ি। এই কঠিন পরিস্থিতিতেই শ্রী মাতাজীর পিতা প্রসাদ রাও সালভের জন্ম হয়।

সাখুবাই ও তাঁর সন্তানদের ঐশ্বর্য‍্য ও স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন ছেড়ে চরম সংযম ও কষ্টের জীবনে মানিয়ে নিতে হয়েছিল। তবুও সন্তানদের শিক্ষা সাখুবাইয়ের কাছে ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, আর তিনি তাঁদের মধ্যে আত্মত্যাগ ও দায়িত্ববোধের মনোভাব গড়ে তুলেছিলেন। ঘরে কেরোসিন শেষ হয়ে গেলে তাঁরা রাস্তার বাতির আলোতেই পড়াশোনা চালিয়ে যেতেন।

সবচেয়ে কনিষ্ঠ প্রসাদ রাও ছিলেন বিশেষভাবে মেধাবী ছাত্র এবং তাঁর সমগ্র শিক্ষাজীবনে তিনি বৃত্তি লাভ করেছিলেন। তিনি আইন পড়াশোনা করেন এবং ছিন্দওয়ারা শহরের একটি সুপরিচিত প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বিবাহ করেন, কিন্তু দুঃখজনকভাবে ৩৭ বছর বয়সে তাঁর প্রথম স্ত্রীর মৃত্যু হয়। প্রথম স্ত্রীর থেকে তাঁর পাঁচ সন্তানের জন্ম হয়েছিল। সন্তানদের কল্যাণের কথা ভেবে আত্মীয়দের অনুরোধে শেষ পর্যন্ত তিনি অনিচ্ছাসত্ত্বেও পুনর্বিবাহ করতে সম্মত হন।

নাগপুরের কর্নেলিয়া করুণা যাদব নামে একজন বিদুষী নারী ছিলেন—যিনি ভারতের প্রথম নারী হিসেবে গণিতে অনার্স ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। তিনি সংস্কৃত ভাষাতে এবং প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতিতে গভীরভাবে পারদর্শী ছিলেন। তাঁর উচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতার কারণে, তাঁর বাবার পক্ষে তাঁর জন্য সমান, যদি না আরও উচ্চতর, শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন জীবনসঙ্গী খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল।

পারস্পরিক বন্ধুদের মাধ্যমে প্রসাদ রাও কর্নেলিয়া ও তাঁর বাবার কাছে বিবাহের প্রস্তাব পাঠান। পাঁচ সন্তানের পিতা, এমন একজন পুরুষের এই প্রস্তাব গ্রহণ করা সহজ সিদ্ধান্ত ছিল না। তবে তাঁর বুদ্ধিমত্তা ও ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস কর্নেলিয়াকে গভীরভাবে মুগ্ধ করেছিল, আর অল্প বয়সে মাকে হারানো তাঁর সন্তানদের প্রতি তিনি গভীর সহানুভূতি অনুভব করেন। শেষ পর্যন্ত তাঁদের বিবাহ হয় ১৯২০ সালের ২১শে জুন।

আমার পূর্বপুরুষরা এই স্থানটি শাসন করতেন এবং এটি ছিল শালিবাহনদের রাজধানী, যার নাম ছিল প্রতিষ্ঠান, যা পরে সহজভাবে পৈঠান নামে পরিচিত হয়। তাঁরা বহু হাজার বছর ধরে এই অঞ্চলের শাসক ছিলেন।

তাঁরাই শালিবাহন রাজবংশের সূচনা করেন। আসলে তাঁরা নিজেদের ‘সাতবাহন’ বলতেন, যার অর্থ সাতটি বাহন (যান)। তাঁরা সাতটি চক্রের সাতটি বাহনের প্রতিনিধিত্ব করত। কত আশ্চর্য যে সবকিছু এতটাই সহজাত (সহজ)।

প্রসাদ রাও ও কর্নেলিয়ার, তাঁদের দেশ এবং তার মহান আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের প্রতি গভীর ভালোবাসা ছিল। ১৯২৫ সালে তাঁদের কন্যা নির্মলা যখন মাত্র দুই বছর বয়সী, তখন তাঁরা প্রথমবার মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন—এবং সেই সাক্ষাৎ তাঁদের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। অহিংস সংগ্রামের মাধ্যমে একটি স্বাধীন ভারতের যে স্বপ্ন গান্ধীজী দেখেছিলেন, তাঁরা তা হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন এবং তাঁর সেই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে নিজেদের একাত্ম করেছিলেন।

ব্রিটিশদের কাছ থেকে প্রসাদ রাও একটি উপাধি পেয়েছিলেন। তাঁরা খ্রিস্টান ছিলেন (যা ব্রিটিশ শাসনকালে বহু বিশেষাধিকার এনে দিত), তবুও তিনি ও তাঁর স্ত্রী স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দিতে এক মুহূর্তও দ্বিধা করেননি। তাঁরা তাঁদের অবস্থান স্পষ্ট করে দেন—নাগপুরে জনসমক্ষে বিদেশে তৈরি কাপড় পর্যন্ত পুড়িয়ে দেন। স্বাধীনতা সংগ্রামে সক্রিয় থাকার কারণে তাঁদের দুজনকেই বহুবার কারাবরণ করতে হয়েছিল, আর তাঁরা পরিবারে একটি নিয়ম করে দিয়েছিলেন যে তাঁদের জন্য কেউ চোখের জল ফেলবে না। ভারতের স্বাধীনতাই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ; আত্মত্যাগ তাঁদের গৃহে ব্যতিক্রম নয়, বরং সহজাত নিয়ম ছিল।

YouTube player

মা–বাবা প্রায়ই বাইরে থাকতেন বা কারাবন্দি থাকতেন বলে শ্রী মাতাজী নিজেই সংসারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন, যাতে তাঁর বড় ভাইবোনেরা নির্বিঘ্নে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেন। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র আট বছর।

কয়েক বছর পর শ্রী মাতাজী স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দেওয়ার মতো যথেষ্ট বড় হয়ে ওঠেন এবং সহপাঠীদেরও এতে অংশ নিতে উৎসাহিত করেন। তিনিও গ্রেপ্তার হন এবং ব্রিটিশদের হাতে নির্যাতিতও হন। তবুও এই অভিজ্ঞতা তাঁর আত্মাকে দুর্বল করতে পারেনি। সারা জীবন তিনি তাঁর মহৎ পূর্বপুরুষদের চিরন্তন মূল্যবোধ—সাহস, আত্মত্যাগ ও করুণা—এর জীবন্ত প্রতিচ্ছবি হয়ে থেকেছেন।

shri-mataji-nirmala-devi-and-family

এইচ. পি. সালভে, 'আমার স্মৃতিকথা' নয়াদিল্লি: লাইফ ইটারনাল ট্রাস্ট, ২০০০