বাস্তুবিদ্যা
একটি প্রাকৃতিক ভারসাম্য
শ্রী মাতাজীর প্রকৃতি-দর্শন ছিল এমন এক ধরিত্রী মায়ের ধারণা, যিনি জীবন প্রদান করেন ও লালন-পালন করেন—এক জীবন্ত সত্তা, যাকে সম্মান করা উচিত, এমনকি পূজ্য মনে করা উচিত। তিনি একবার ব্যাখ্যা করেছিলেন যে, কীভাবে তাঁকে ও তাঁর ভাইবোনদের শেখানো হয়েছিল যে সমস্ত ভারতীয় শিশুদের মতো সকালে ধরিত্রী মায়ের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে, "কারণ আমরা তাকে আমাদের পা দিয়ে স্পর্শ করি।”
শ্রী মাতাজী প্রায় ৪০ বছর ধরে সারা বিশ্ব ভ্রমণ করেছেন মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তিকে জাগ্রত করার জন্য, যাতে তারা শান্তিপূর্ণ ও অহংকারমুক্ত মানসিক অবস্থায় পৌঁছাতে পারে। যারা তাঁর সম্মেলন ও ধ্যান অধিবেশনে আসতেন, তারা ছিলেন প্রকৃতপক্ষে আধ্যাত্মিকতার অনুসন্ধানী। তিনি তাঁদের স্পষ্ট করে জানিয়েছিলেন যে, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি না করলে আধ্যাত্মিকতার বিকাশ সম্ভব নয়।
১৯৭০–এর দশকের শুরুতেই, যখন তিনি সহজ যোগের মাধ্যমে তাঁর কাজ শুরু করেছিলেন, শ্রী মাতাজী স্পষ্টভাবে আসন্ন বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন যা একদিন আমাদের বাস্তুতন্ত্রকে বিপদের মুখে ফেলবে - প্লাস্টিকের অত্যধিক উৎপাদন, পারমাণবিক শক্তির বিপদ, কৃষির অত্যধিক শোষণ, যানবাহন দূষণ এবং আমাদের সমুদ্র, হ্রদ এবং নদীর দূষণ।
তিনি স্বীকার করেছেন যে, কিছু ক্ষেত্রে প্লাস্টিক উপকারী হতে পারে, কিন্তু এর অতিরিক্ত ব্যবহারের তিনি কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, প্লাস্টিক তৈরির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা বিপুল অর্থ উপার্জন করে নিজেদের আর্থিক অবস্থান শক্তিশালী করছেন। এদিকে বোধহীন ভোক্তাবাদ পাহাড়ের পর পাহাড় প্লাস্টিক সৃষ্টি করছে, ফলে মানুষ বুঝতেই পারছে না কীভাবে এই মানবসৃষ্ট পাহাড়গুলো ধ্বংস করার সমস্যার সমাধান করা যাবে। যা শুধু দৃষ্টিকটুই নয়, বরং এদের অস্তিত্ব পরিবেশ ও বায়ুমণ্ডলেরও ক্ষতি করছে। ফ্যাশনের ধারণা দ্বারা চালিত বাধ্যতামূলক ভোক্তাবাদের একটি গুরুতর উপজাত হলো প্লাস্টিক ও কৃত্রিম তন্তুর অতিরিক্ত উৎপাদন, যা ভবিষ্যতে মানবসমাজের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
শ্রী মাতাজী নির্মলা দেবী চেরনোবিল ও ফুকুশিমার মতো দুর্ঘটনার বহু আগেই পারমাণবিক শক্তির ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি বলেন, “চেরনোবিল একটি ভয়াবহ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল এবং এটি আমাদের জন্য একটি শিক্ষা যে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার নিয়ে অতিরিক্ত উৎসাহী হওয়া উচিত নয়।” তাঁর মতে, পারমাণবিক বিভাজন (nuclear fission) প্রকৃতির একটি পরমাণুর স্বাভাবিক ঐক্যের উপর এক ধরনের আক্রমণ। এই কারণেই সূক্ষ্ম স্তরে নিউক্লিয়াসের এই স্বাভাবিক সামঞ্জস্য ভঙ্গের ফলেই শক্তি উৎপাদনের সঙ্গে সঙ্গে ধ্বংসাত্মক উপপণ্যও সৃষ্টি হয়।
তিনি শক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আধুনিক অপচয়ী মানসিকতার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছিলেন এবং দৈনন্দিন জীবনে মিতব্যয়ী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে উৎসাহ দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, “প্রত্যেকেরই সচেতন হওয়া উচিত যে সে কতটা শক্তি ব্যবহার করছে—বিদ্যুৎ, টেলিফোন, জল বা অন্য যেকোনো কিছুর ক্ষেত্রে। তিনি আরও বলেন, “আমাদের এতে মিতব্যয়ী হতে হবে… তোমাদের দৈনন্দিন জীবনে এটিকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে, যাতে তোমরা এই ধরিত্রী মায়ের শক্তি সংরক্ষণ করার চেষ্টা করো। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।"
অনেক সময় শ্রী মাতাজী নির্মলা দেবী রাস্তায় একই দিকে চলা একক যাত্রীবাহী গাড়ির সংখ্যা সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করতেন। তিনি কারপুলিং বা একসাথে গাড়ি ব্যবহার করার পরামর্শ দিতেন, যাতে দূষণ কম হয় এবং সমাজে সম্মিলিত দায়িত্ববোধ গড়ে ওঠে। তিনি প্রায়ই হাঁটার কথাও বলতেন। অত্যন্ত ব্যস্ত ও তাড়াহুড়োর জীবনে হাঁটা মানুষের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা এবং অন্তরের ভারসাম্য সৃষ্টি করতে সহায়তা করে।
শব্দের ঊর্ধ্বে গিয়েও, শ্রী মাতাজী-র ব্যক্তিগত উদাহরণই সম্ভবত তাঁর শিক্ষার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রভাব ছিল। তিনি যে স্থানেই গেছেন, সেখানকার স্থানীয় কারিগরদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন এবং তাঁদের হস্তশিল্প ক্রয় করে তাঁদের সমর্থন করেছেন। তিনি কারিগরদের কাজের সমস্ত ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়েও আগ্রহী ছিলেন— যেমন কোন উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলোর উৎস কোথায়, কাজের পরিবেশ কেমন এবং কারিগরদের পরিবারের জীবনযাত্রার মান কেমন।
তিনি প্রায়ই এই হস্তনির্মিত পণ্যের পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক গুরুত্বের কথা উল্লেখ করতেন। এগুলো কেনার মাধ্যমে ভোক্তারা বড় শিল্পগোষ্ঠী, ফ্যাশনের অন্ধ অনুকরণ করে এবং ব্যবহার করে ফেলে দেওয়ার সংস্কৃতির দাসত্ব থেকে মুক্ত হতে পারেন। তারা অতিরিক্ত ব্যবহারও কমিয়ে দেন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেন। মানুষের শ্রম ও সময় বিনিয়োগের কারণে হস্তনির্মিত জিনিসের দাম সাধারণত যন্ত্রে ব্যাপকভাবে তৈরি পণ্যের তুলনায় বেশি হয়। তবে এর ফলে মানুষ সেই জিনিসকে মূল্য দেয় এবং সহজে ফেলে না দিয়ে যত্নসহকারে ব্যবহার করে।
একই সঙ্গে তিনি শিল্প উৎপাদন ও যন্ত্রের উপযোগিতা স্বীকার করেছিলেন, তবে হাতের তৈরি ও যন্ত্রে তৈরি জিনিসের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, জনসাধারণের কাজের জন্য যন্ত্র ব্যবহার করা উচিত। যেমন মোটরগাড়ি, ট্রেন, ট্রাম—যে সব কাজ বাইরের বা সামাজিক প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয়, সেখানে যন্ত্র প্রয়োজন। বাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রেও প্রয়োজনে যন্ত্র ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু ব্যক্তিগত ব্যবহারের জিনিসের ক্ষেত্রে অবশ্যই হাতে তৈরি জিনিস ব্যবহার করা উচিত। তাঁর মতে, বিশেষ করে আধ্যাত্মিক মানুষের জন্য হাতে তৈরি বা আসল জিনিস পরা ও ব্যবহার করা বেশি উপযুক্ত এবং অর্থপূর্ণ।
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বিশ্ব আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যা অভূতপূর্ব মাত্রার বৈশ্বিক পরিবেশগত বিপর্যয়ের হুমকি দিচ্ছে। বর্তমান বৈজ্ঞানিক গবেষণাগুলি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় যে শিল্পযুগের শুরু থেকে মানুষের অগ্রাধিকার ও জীবনযাপনের ধরনে যে পরিবর্তন এসেছে, তা বিশ্ব পরিবেশের অবনতিতে বড় ভূমিকা রেখেছে, এবং একই সঙ্গে এগুলো দেখায় যে কেবল সমগ্র মানবজাতির সমন্বিত প্রচেষ্টায় টেকসই জীবনযাত্রার দিকে নিজেদের মানিয়ে নিলেই আমরা এই আসন্ন বিপদ থেকে বেরিয়ে আসতে পারি।
সহজ যোগ ধ্যানের অনুশীলন শরীর, মন এবং আত্মার মধ্যে একটি সামগ্রিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করে, এর ফলে মানুষ পরোপকারী জীবনধারা অনুসরণ করতে পারে, তা উপভোগ করতে পারে এবং প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে জীবনযাপন করতে সক্ষম হয়। সহজ যোগের মাধ্যমে যে আচরণগত পরিবর্তন সহজেই অর্জন করা যায়, তার বাইরে শ্রী মাতাজী পরামর্শ দিয়েছিলেন সূক্ষ্ম পরমচৈতন্য শক্তির ব্যবহার করার জন্য, যা সহজ যোগ অনুশীলনকারীর সচেতনতার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে এবং এর মাধ্যমে প্রকৃতি মায়ের জীবন্ত শক্তিকে পুনরুজ্জীবিত করা যায় ও প্রাকৃতিক পরিবেশের স্বাভাবিক বিকাশকে উৎসাহিত করা যায়। বিশ্বজুড়ে সহজ যোগী পরিচালিত হাজার হাজার কৃষি পরীক্ষায় [১] আশ্চর্যজনক ফলাফল দেখা গেছে। এসব পরীক্ষায় আমাদের জীবমণ্ডলের উন্নতি ঘটেছে এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক সার ব্যবহারের উপর নির্ভরতা কমাতে সাহায্য করেছে।
শ্রী মাতাজীর ভারসাম্যপূর্ণ পৃথিবীর স্বপ্ন শুরু হয় সেইসব মানুষদের দিয়ে যারা নিজেদের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখে। কেবলমাত্র এই অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হলে মানুষ পরিবেশ ও ধরিত্রী মায়ের সাথে একটি সুন্দর এবং শ্রদ্ধাশীল সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে, যিনি আমাদের সকলকে ধারণ করে আছেন।