জ্ঞান ও সূক্ষ্ম তন্ত্র

জ্ঞানের মূল উৎস – সূক্ষ্ম তন্ত্র

আমাদের অভ‍্যন্তরীন সত্ত্বার প্রাচীন বিজ্ঞান

যোগে দক্ষতা অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আমাদের ভিতরের সূক্ষ্ম দেহযন্ত্রের পূর্ণ জ্ঞান অর্জন। এই সূক্ষ্ম ব্যবস্থা আমাদের অভ্যন্তরীণ চেতনার বিকাশের পথনির্দেশক হিসেবে কাজ করে — যার মাধ্যমে আমরা আত্মিক উত্তরণের অভিজ্ঞতা লাভ করি।

প্রাচীন ভারতীয় বৈদিক শাস্ত্রগুলি এই সূক্ষ্ম দেহযন্ত্রের ব্যবস্থাটি বর্ণনা করেছেন। নদীর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত জলের মতো, নাড়ীগুলি আমাদের সত্ত্বায় সূক্ষ্ম শক্তির প্রবাহকে সহজ করে। এই ব‍্যবস্থায় চক্র (সূক্ষ্ম শক্তি কেন্দ্র) এবং কুণ্ডলিনী (অর্থাৎ কুণ্ডলীকৃত শক্তি যা আমাদের স্যাক্রাম হাড়ে উপস্থিত) রয়েছে। আমাদের সূক্ষ্ম দেহটি তিনটি প্রধান নাড়ী, ইড়া, পিঙ্গলা, সুষুম্না এবং সাতটি চক্রের কাঠামোর মধ্যে থাকা হাজার হাজার নাড়ী এবং চক্র নিয়ে গঠিত। মূল সাতটি চক্র হল মূলাধার, স্বাধিষ্ঠান, নাভি, অনাহত, বিশুদ্ধি, আজ্ঞা এবং সহস্রার

আত্মা, যা শাশ্বত, আমাদের হৃদয়ে প্রতিফলিত হয়।

Chakra Charts_BN_Page_11_Image_0001

যেভাবে আমাদের দেহে একটি জটিল স্নায়বিক তন্ত্র এবং স্নায়ুজালক রয়েছে, যা আমাদের ইন্দ্রিয় ও চলন প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে, ঠিক সেভাবেই প্রত্যেক মানুষের মধ্যে একটি সহজাত সূক্ষ্ম ব্যবস্থা বিদ্যমান, যা সিম্প্যাথেটিক এবং প্যারাসিম্প্যাথেটিক স্নায়ুতন্ত্রের সঙ্গে অত্যন্ত সুন্দরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই সূক্ষ্ম ব্যবস্থাটি বিভিন্ন নাড়ী এবং চক্র নিয়ে গঠিত। এটি আমাদের স্নায়বিক ব্যবস্থা ও মস্তিষ্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থেকে আমাদের শারীরিক, বৌদ্ধিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক অবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বিত করে। এই সূক্ষ্ম ব্যবস্থার জটিল কাজকর্মকে একটি কম্পিউটারের সফটওয়্যার-এর সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে — যেমন সফটওয়্যার ছাড়া হার্ডওয়্যার অচল, তেমনি সূক্ষ্ম ব্যবস্থার জাগৃতি ছাড়া মানবজীবন পূর্ণতায় পৌঁছাতে পারে না।

সূক্ষ্ম ব্যবস্থার জ্ঞান মানুষের মধ‍্যে হাজার হাজার বছর আগে থেকেই বিদ্যমান। প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্রে উল্লেখ আছে যে ভগবান শিব ছিলেন প্রথম আদিযোগী — যিনি এই গভীর যোগবিদ্যার জ্ঞান প্রথমে সপ্তঋষিদের প্রদান করেন। এই সাত ঋষি সেই জ্ঞানকে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে দেন। যদিও যোগের মূলধারা বিভিন্ন সংস্কৃতিতে প্রবাহিত হয়েছে, তবুও ভারতেই এই যোগ-ব্যবস্থা তার পূর্ণ রূপ ও গভীরতা লাভ করে। ধ্যান, চক্র, প্রাণায়াম, ও আত্মসাক্ষাৎকার-ভিত্তিক একটি বিস্তৃত আধ্যাত্মিক বিজ্ঞান, যার ভিত্তি হলো এই সূক্ষ্ম ব্যবস্থা — যা নাড়ী, চক্র এবং কুণ্ডলিনী শক্তির সঙ্গে যুক্ত।

যদিও ভারতীয় যোগ-পরম্পরায় আমাদের সূক্ষ্ম ব্যবস্থার জ্ঞান সুপ্রচলিত ছিল, তবুও শ্রী মাতাজী-ই প্রথম এই সম্পূর্ণ সূক্ষ্ম ব্যবস্থার জটিল কার্যপ্রণালীকে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেন এবং দেখান কিভাবে এই ব্যবস্থা একটি জীবন্ত দেহে অস্তিত্ব বজায় রাখে — এমনকি গর্ভে ভ্রূণের বিকাশ কালের শুরু থেকেই।

তিনি আরোও ব্যাখ্যা করেন যে, এই সূক্ষ্ম ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন চক্র, নাড়ী ও কুণ্ডলিনী শক্তি — যা জন্মের পূর্বেই গঠিত হতে শুরু করে এবং এটি মানব জীবনের প্রতিটি স্তরের সঙ্গে যুক্ত থেকে, শারীরিক, মানসিক, বৌদ্ধিক ও আধ্যাত্মিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শ্রী মাতাজীর এই অভূতপূর্ব ব্যাখ্যা আধুনিক যুগে যোগ ও আত্মসাক্ষাৎকার-এর জগতে একটি বিপ্লব নিয়ে আসে, যেখানে মানুষ শুধুমাত্র তত্ত্ব নয়, বরং এই সূক্ষ্ম ব্যবস্থার বাস্তব অভিজ্ঞতাও লাভ করতে পারে ধ্যানের মাধ্যমে।

তাই শিশু যখন মাতৃগর্ভে দুই মাসের হয়, তখন এই প্রাণশক্তি জীবাত্মায় প্রবেশ করে। এটা সেই জায়গা যেখানে এটা এসে থাকে। (এই প্রাণশক্তি) মাথার তালু থেকে (ভিতরে) নীচের দিকে, মস্তিষ্কের মাঝখান দিয়ে নেমে যায়, সুষুম্নাকাণ্ড যাকে তথাকথিতভাবে মেরুদণ্ড বলা হয়, তার মধ্যে দিয়ে নীচে একেবারে ত্রিকোণ অংশ (অস্থি) পর্যন্ত। যখন এই শক্তি নামতে থাকে, তখন এটি মাঝে মাঝে থেমে চক্রগুলির সৃষ্টি করে। সূক্ষ্ম দেহের চক্রগুলির বাহ্যিক প্রকাশ ঘটে পরাসমবেদী স্নায়ুতন্ত্রের প্লেক্সাস বা স্নায়ু জালক রূপে।

একটি সাধারণ প্রিজমে আলোর বেঁকে যাওয়ার উপমা ব্যবহার করে, শ্রী মাতাজী ব্যাখ্যা করেন কিভাবে মানুষের মস্তিষ্ক — যা লক্ষ লক্ষ বছর ধরে একটি সমতল কাঠামো থেকে এক ধরনের প্রিজমের মতো জটিল আকারে বিবর্তন লাভ করেছে এবং সূক্ষ্ম শক্তির একটি জটিল স্থাপত্য গঠন করেছে।

একজন আত্মসাক্ষাৎপ্রাপ্ত ব্যক্তি প্রায়শই অনুভব করতে পারেন যে, নবজাতক শিশুর ব্রহ্মরন্ধ্র থেকে এক ধরনের শীতল বাতাস নির্গত হচ্ছে।

শ্রী মাতাজী এই ঘটনাকে ব্যাখ্যা করেছেন ঈশ্বরের সর্বব্যাপী প্রেমের শক্তি — যাকে তিনি পরমচৈতন্য নামে অভিহিত করেন। শিশুরা প্রায়ই কোনো না কোনো একটি আঙুল মুখে ঢুকিয়ে থাকে — যা দেখে আত্মসাক্ষাৎপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা সহজেই বুঝতে পারেন যে এটি তাদের কোনো নির্দিষ্ট চক্রে বাধাকে নির্দেশ করছে। প্রতিটি আঙুল একেকটি চক্রের সঙ্গে যুক্ত, তাই কোন আঙুল, তার ভিত্তিতে চক্রের অবস্থাও বোঝা যায়। তবে, শিশুর মধ্যে অহংকার ও সংস্কারের বোধ বিকশিত হওয়ার ফলে, এবং মাথার তালু ভাগের হাড়টি আস্তে আস্তে শক্ত হয়ে গেলে এই সূক্ষ্ম সচেতনতা ধীরে ধীরে লোপ পেতে থাকে। ফলে আমরা আমাদের চারপাশের স্হূল জগতের সাথে বন্ধনে জড়িয়ে পড়ি।

আত্মসাক্ষাৎকার এবং ধ্যান প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমরা আমাদের সূক্ষ্ম সত্ত্বায় এই আদি সংযোগ পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হই।

YouTube player