চতুর্থ বিশ্ব সম্মেলন

জাতিসংঘের নারীদের চতুর্থ বিশ্ব সম্মেলন

১৯৯৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বেইজিং আন্তঃআঞ্চলিক গোলটেবিল বৈঠক থেকে উদ্ধৃতাংশ

১৯৯৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে চীনের বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত চতুর্থ বিশ্ব সম্মেলন ছিল নারীদের ও লিঙ্গসমতার বিষয়ে পূর্ববর্তী তিনটি বৈশ্বিক সম্মেলনে গৃহীত রাজনৈতিক চুক্তিগুলির পরিণতি। ১৮৯টি দেশ সর্বসম্মতিক্রমে বেইজিংয়ে নারীর ক্ষমতায়নের কর্মসূচি গ্রহণ করে, যা লিঙ্গসমতার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান বৈশ্বিক নীতিগত দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়।

এই বৈশ্বিক মঞ্চে শ্রী মাতাজীকে অতিথি বক্তা হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। নারীর ভূমিকা সম্পর্কে তিনি সবসময়ই তাঁর মতামত খুব স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, এই পৃথিবীতে নারীদের ভূমিকাও পুরুষদের মতোই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু নারীদের উচিত লিঙ্গগত পার্থক্যকে কাজে লাগানো, পুরুষদের মতো হওয়ার চেষ্টা না করে।পুরুষ ও নারীর মধ্যে সঠিক ভারসাম্য একটি স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। পার্থক্যগুলিকে স্বীকার করা এবং একে অপরের শক্তিকে সম্মান করা—এই বিষয়গুলিই ছিল অপরিহার্য। তিনি বারবার মানুষকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, নারী ও পুরুষ উভয়েরই, নিজেদের অন্তর্নিহিত “পুরুষালি” ও “নারীসুলভ” দিকগুলির মধ্যে এক অন্তর্গত ভারসাম্য খুঁজে পাওয়া দরকার। তবে যেখানে নারীরা প্রকৃতপক্ষে বড় প্রভাব ফেলতে পারে, তা হল সামাজিক স্তরে।

সত্য হল, নারীরাই প্রতিটি সভ্যতা ও প্রতিটি দেশের সম্ভাব্য শক্তি। স্পষ্টই দেখা যায় যে সমগ্র মানবজাতির স্রষ্টা ও রক্ষক হলেন নারীরা। এই ভূমিকাই সর্বশক্তিমান ঈশ্বর তাঁদেরকে দিয়েছেন, তাঁদের উপর অর্পণ করেছেন।

শ্রী মাতাজী কখনও নিজেকে একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে দেখেননি। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল আত্মসাক্ষাৎকারের মাধ্যমে নারী ও পুরুষ উভয়ের মধ্যেই এক অন্তর্গত রূপান্তর ঘটানো, যার মাধ্যমে তারা একটি স্বাভাবিক ভারসাম্য অর্জন করতে পারে। এই আত্মরূপান্তরই ছিল সেই মূল চাবিকাঠি, যার মাধ্যমে পুরুষ-প্রধান পৃথিবীতে নারীরা যে বহু সমস্যার সম্মুখীন হয়, তার সমাধান সম্ভব।

“বীজ নিজেরাই কিছু সৃষ্টি করতে পারে না। মা পৃথিবীই ফুল, ফল এবং অন্যান্য সম্পদ প্রদান করে। একইভাবে, নারীই সন্তানের জন্ম দেয়, শিশুকে লালন-পালন করে এবং শেষ পর্যন্ত আগামী দিনের নাগরিকদের গড়ে তোলে। তাই নারীদের সমগ্র মানবজাতির ভিত্তি হিসেবে মা পৃথিবীর সমতুল্য মর্য‍্যাদায় অধিষ্ঠিত হওয়া উচিত।”

পূর্ব ও পশ্চিম উভয় সমাজেই বাস করে এবং ব্যাপকভাবে ভ্রমণ করার ফলে তিনি দেখেছিলেন নারীদের সঙ্গে আচরণের ভিন্নতা। যদিও তিনি স্বীকার করেছিলেন যে অনেক ক্ষেত্রেই নারীদের অধিকারের গুরুতর অভাব রয়েছে, কিন্তু নারীদের প্রতি সম্মানের অভাবই তাঁকে বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন করেছিল।

আমার নিজের দেশে একটি কথা আছে—“যত্র নার্যঃ পূজ্যন্তে তত্র রমন্তে দেবতা”, যার অর্থ, “যেখানে নারীদের সম্মান করা হয় এবং তারা সম্মানীয়, সেখানে আমাদের কল্যাণের দেবতারা বাস করেন।

যখন নারী ও পুরুষ উভয়েই নিজেদের মূল্য এবং একে অপরের মূল্য উপলব্ধি করবে—যা তাঁর মতে আত্মসাক্ষাৎকারের মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব—তখন মানবজাতির মধ্যে সত্যিকারের সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠিত হবে।

“সুতরাং এই মুহূর্তে আমাদের জন্য প্রয়োজন, আমাদের স্রষ্টা যে মহান শক্তি আমাদের দিয়েছেন তার মূল্য উপলব্ধি করা। কিন্তু আমরা কী দেখি? পূর্ব হোক বা পশ্চিম, নারীরা এখনও তাদের মহত্ত্বের পূর্ণ প্রকাশ ঘটাতে সক্ষম হয়নি।”

নিশ্চয়ই, শ্রী মাতাজী নারীদের শিক্ষার অধিকার, পেশা গড়ে তোলার অধিকার, নিরাপদ জীবনযাপনের পরিবেশ এবং আইনি সুরক্ষার সমান অধিকারের পক্ষে সমর্থন করেছিলেন।

“আমি মোটেই এই কথা বলছি না যে মানবসমাজে নারীর একমাত্র ভূমিকা হল মা হওয়া—সন্তানের জন্মদান ও লালন-পালন করা, অথবা কেবল স্ত্রী বা বোনের ভূমিকা পালন করা। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে—সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক এবং অন্যান্য সব ক্ষেত্রে—সমান অংশীদার হিসেবে অংশগ্রহণ করার পূর্ণ অধিকার নারীদের রয়েছে … কিন্তু যদি তারা মা হন, তবে তাদের সন্তানদের প্রতি এবং সমাজের প্রতিও একটি মহান দায়িত্ব থাকে।”

তবে শ্রী মাতাজীর মতে, নারী ও পুরুষের মধ্যে যে অসামঞ্জস্য রয়েছে তা সত্যিকার অর্থে সংশোধন করা সম্ভব তখনই, যখন আমরা নিজের অন্তরের দিকে ফিরে যাই এবং আত্মসাক্ষাৎকারের শক্তিকে আমাদের পথনির্দেশ করতে দিই।

“আমাদের প্রয়োজন এই দুই চরম অবস্থার মধ্যে একটি ভারসাম্য। আমাদের দরকার নারী—পুরুষের সমান, কিন্তু অনুরূপ নয়—এমন এক সহযাত্রী হিসেবে….”

নিজের মধ্যেই শান্তি ধারণ করতে সক্ষম এক ভারসাম্যপূর্ণ মানবজাতি গড়ে তোলার জন্য আমাদের প্রয়োজন ভারসাম্যপূর্ণ নারী।