প্রারম্ভিক জীবন

প্রারম্ভিক জীবন

মহাত্মা গান্ধীর স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে আত্মিক মুক্তির এক যুগে উত্তরণ।

মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে যাঁরা সাক্ষাৎ করেছেন, তাঁদের সবার উপরই তিনি এক গভীর ও স্থায়ী প্রভাব ফেলেছিলেন—এর মধ্যে ছিল একটি ছোট মেয়েও, যে তাঁর আশ্রমে থাকত। সেই ছোট মেয়েটিই ছিলেন শ্রী মাতাজী, যাকে তিনি তাঁর নেপালি-সদৃশ চেহারার জন্য স্নেহ করে “নেপালি” বলে ডাকতেন।

সাতবছর বয়স থেকেই শ্রী মাতাজী গান্ধীজীর আশ্রমে তাঁর সঙ্গে বহু সময় অতিবাহিত করেছেন। "তিনি আমার কাছে বসতেন, খুবই গুরুত্বের সঙ্গে খুবই মধুর সব প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতেন।" স্মৃতি চারণ করে বললেন শ্রী মাতাজী, যিনি প্রায়শই সম্মিলিত প্রার্থনার পূর্বে প্রাতঃভ্রমণকালে তাঁর (গান্ধীজী) সঙ্গে ভ্রমণ করতেন।

shri-mataji-as-a-young-child

"তিনি ছিলেন প্রচণ্ড কঠিন শিক্ষক, কিন্তু অতি স্নেহময়, সহানুভূতিশীল মানুষ," বললেন শ্রী মাতাজী। "তিনি সর্বদাই এমনভাবে আমার সঙ্গে কথা বলতেন যেন আমি একজন ঠাকুরমা এবং আমার সঙ্গে যেভাবে বিষয়গুলো আলোচনা করতেন, অন্যদের কাছে যা সবচেয়ে বিস্ময়কর ছিল, মনে হতো যেন আমি সকলের থেকে জ্ঞানী। গান্ধিজী বলতেন যে বয়স্কদের চেয়ে কিছু শিশুদের থেকে পথনির্দেশ নেওয়া বেশী ভালো।"

পরবর্তীকালে শ্রী মাতাজী গান্ধীজীকে প্রশংসা করে বলেছিলেন যে তিনি দেশে অন্তর্নিহিত ধর্ম বা ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।
তিনি মানুষকে বাইবেল অধ্যয়ন করতে উৎসাহিত করতেন। তিনি ভগবত গীতাকে বুঝতে, বিশ্বের সকল মহান শাস্ত্র ও মহাপুরুষদের সম্পর্কে জানতে এবং তাদের সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গিকে উপলব্ধি করতে বলতেন।

মহাত্মা গান্ধী–র সঙ্গে তাঁর আলাপচারিতার সময় তাঁরা শুধু মানব-ব্যক্তিত্বের অন্তর্নিহিত স্বভাব নিয়েই আলোচনা করতেন না, বরং সামাজিক ও আধ্যাত্মিক মুক্তি আনার উপায় ও পদ্ধতি সম্পর্কেও গভীরভাবে চিন্তা করতেন।
গান্ধীর সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে শ্রী মাতাজী তাঁদের একটি আলোচনার উল্লেখ করেন: মহাত্মা গান্ধী তাঁর নিয়মকানুনের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর ছিলেন—তিনি মানুষকে ভোর ৪টায় জাগতে বলতেন, উপবাস পালন করতে বলতেন ইত্যাদি। তখন শ্রী মাতাজী তাঁকে বলেছিলেন, “আপনি অত্যন্ত কঠোর...এই সবকিছু কি বেশি হয়ে যাচ্ছে না?”

গান্ধীজী বলেছিলেন যে, যখন দেশের স্বাধীনতার আন্দোলন গতি পাচ্ছে এবং একটা জরুরি অবস্থা চলছে, তখন কঠোর শৃঙ্খলা বজায় রাখা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়l

এর উত্তরে শ্রী মাতাজী প্রস্তাব করেছিলেন যে, “বাপু, যদি আপনি মানুষকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করতে চান, তবে তাদের অন্তর থেকেই শৃঙ্খলা কেন প্রদান করছেন না?”

মহাত্মা গান্ধী জিজ্ঞাসা করেছিলেন, এটি কীভাবে সম্ভব হতে পারে। শ্রী মাতাজী তাঁকে আশ্বস্ত করেন যে অন্তরের রূপান্তরই এর উত্তর।
কিন্তু তিনি যুক্তি দিয়ে বলেছিলেন, “সবার আগে আমাদের স্বাধীন হতে হবে (ব্রিটিশ শাসন থেকে)। আমরা যদি স্বাধীনই না হই, তবে কী উপভোগ করব? এ নিয়ে আমরা কথা বলতে পারি না। মানুষ বলবে, আমরা এখনও স্বাধীন নই—তাহলে আত্মার স্বাধীনতার কথা কীভাবে বলি? প্রথমে আমাদের বিদেশি শাসন থেকে মুক্ত হতে হবে।”

পরবর্তী বছরগুলোতে মহাত্মা গান্ধীর বার্তা, নিরক্ষর কৃষক থেকে শুরু করে সমাজের উচ্চতর শ্রেণির মানুষ এবং সর্বোচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তিদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে।
শ্রী মাতাজীও স্বাধীনতা সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং অন্যান্য কলেজ শিক্ষার্থীদের অনুসরণ করার জন্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

১৯৪৭ সালে ভারত অবশেষে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হয়। শ্রী মাতাজীর শৈশবের মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে সেই আলোচনা থেকে বহু বছর পেরিয়ে গিয়েছিল; তবে তাঁর মৃত্যুর অল্প কিছু আগে তিনি শ্রী মাতাজীকে দেখতে চেয়েছিলেন। শ্রী মাতাজীর ভাষায় “আমি তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম…তিনি সঙ্গে সঙ্গেই আমাকে চিনতে পারলেন,"। “তিনি বললেন, ‘প্রার্থনার পর আমার সঙ্গে দেখা করো।’ যখন আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করলাম, তিনি বললেন, ‘এবার গঠনমূলক কাজে প্রবৃত্ত হও। গঠনমূলক কাজে নিজেকে নিয়োজিত করো…’”

শ্রী মাতাজী মানবজাতির সামনে উপস্থিত বিভিন্ন সমস্যার পাশাপাশি তাদের সম্ভাব্য সমাধান নিয়েও গবেষণা ও অধ্যয়ন চালিয়ে যেতে থাকেন। সহজ যোগের মাধ্যমে তাঁর আধ্যাত্মিক কাজ শুরু করতে আরও কয়েক বছর সময় বাকি ছিল।
যেমন মহাত্মা গান্ধী সমগ্র জনসাধারণকে আন্দোলিত করে তাঁর দেশকে স্বাধীনতার পথে পরিচালিত করেছিলেন, তেমনি শ্রী মাতাজীর কাজও কেবল কয়েকজন ব্যক্তিকে নয়, বরং বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের আত্মিক রূপান্তরের কাজ ছিল।
অন্তরের স্বাধীনতার সময় এসে গিয়েছিল।

YouTube player

একজন রাজনৈতিক নেতার আত্মা ও ধর্ম নিয়ে চিন্তিত হওয়ার প্রয়োজন নাও থাকতে পারে, কিন্তু তিনি আমাদের দেশকে যোগের ভূমি বলে মনে করতেন…
মহাত্মা গান্ধীর প্রধান অবদান ছিল মানুষের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা এবং তাদের আরও প্রকৃত অর্থে ভারতীয় করে তোলা—আমাদের মধ্যে যে দাসসুলভ মানসিকতা ধীরে ধীরে প্রবেশ করেছিল, তা দূর করা।

শ্রী মাতাজী নির্মলা দেবীর জন্মস্থান, ছিন্দওয়ারা, ভারত
শ্রী মাতাজী নির্মলা দেবীর জন্মস্থান, ছিন্দওয়ারা, ভারত