এক আলোকিত শিক্ষাব্যবস্থা
অন্তরের আধ্যাত্মিক স্থিতির প্রতিপালন
শিশুদের এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও বেশি একটি সুষম শিক্ষার প্রয়োজন। এই শিক্ষা কেবল তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও মানসিক বিকাশের লালন-পালন করবে না, বরং তাদের আধ্যাত্মিক সুস্থতার প্রতিও গুরুত্ব দেবে। যখন শিশুরা নিজেদের অন্তর্নিহিত ক্ষমতা ও শক্তিকে বুঝতে শেখে, তখন তারা যেকোনো পরিবেশে বিকশিত হতে পারে। একাগ্র মনোযোগ এবং বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি আলোকিত শিক্ষার আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ চাবিকাঠি।
শ্রী মাতাজী প্রাথমিক শৈশব শিক্ষার মাধ্যমে একটি দৃঢ় ভিত্তি গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, এটি হওয়া উচিত একটি সমষ্টিগত প্রক্রিয়া, যেখানে অভিভাবক ও শিক্ষক উভয়েই অংশীদার হবেন। প্রাকৃতিক পরিবেশও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিশুরা যখন উদ্ভিদ, প্রাণী ও সংরক্ষণ সম্পর্কে শেখে, তখন তারা ধরিত্রী মাতার প্রতি এবং তাঁর অমূল্য সম্পদের প্রতি সম্মানবোধ অর্জন করে।
"পুঁথিগত শিক্ষার কোনো মূল্য নেই, যদি তা এক সুদৃঢ় চরিত্র গঠন করতে সক্ষম না হয়।"
মহাত্মা গান্ধী
আত্মসম্মান ও মর্যাদাবোধ জাগ্রত করার জন্য শ্রী মাতাজী শৃঙ্খলার উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন—এক এমন শৃঙ্খলা, যা প্রেম ও শ্রদ্ধার ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত।
শ্রী মাতাজীর ভাষায়, “আমাদের কর্তব্য হলো এটা দেখা যে আমাদের সন্তানরা মহান মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে, আমাদের থেকেও মহান... তাদেরকে পৃথিবীর দায়িত্ব নিতেই হবে।
নিজের দৃষ্টিভঙ্গিকে বাস্তবে রূপ দিতে শ্রী মাতাজী সহজ যোগ ধ্যানকে ভিত্তি করে একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন। কঠোর ও মানসম্মত পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ধ্যানের বিষয়ে জোর দেওয়া হয়। এর ফলে তাদের মনোযোগ ও একাগ্রতার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, পাশাপাশি আত্মবিশ্বাস ও আত্ম-উপলব্ধির বোধ তৈরি হয়।
ভারত, ইতালি, কানাডা, অস্ট্রিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, চেক প্রজাতন্ত্র, রাশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থিত শ্রী মাতাজীর বিদ্যালয়গুলোতে বিশ্বের নানা প্রান্তের তরুণ-তরুণীরা বিকশিত হচ্ছে এবং সেখানে তারা গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলছে।
শিশুদের প্রসঙ্গে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মন্তব্য করেছিলেন,
“তারা জীবন্ত সত্তা—তাদের জীবনশক্তি সেই সব প্রাপ্তবয়স্কদের থেকেও বেশি, যারা নিজেদের চারপাশে অভ্যাসের খোলস তৈরি করে ফেলেছে। তাই তাদের মানসিক স্বাস্থ্য ও বিকাশের জন্য একান্ত প্রয়োজন যে তারা শুধু পাঠ নেওয়ার জন্য বিদ্যালয়েই সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং এমন এক জগতে বেড়ে ওঠে যার পথপ্রদর্শক হলো ব্যক্তিগত ভালোবাসা।
আজকের শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ, এবং এদের জন্য উন্নত মানের শিক্ষায় বিনিয়োগ করার অর্থ একটি উন্নত বিশ্বের জন্য বিনিয়োগ করা। কিন্তু বিদ্যালয়ে শিশুদের সামাজিক ও মানসিক সুস্থতা ক্রমশ ব্যাহত হচ্ছে। প্রতি বছর অন্তত পাঁচজনের মধ্যে একজন শিশু বা কিশোর কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার লক্ষণ প্রকাশ করতে পারে। আর যুক্তরাষ্ট্রে অনুমান করা হয় যে দশজনের মধ্যে একজন শিশু বা কিশোর এমন গুরুতর মানসিক অসুস্থতায় ভোগে, যা তাদের কার্যক্ষমতায় কিছু মাত্রায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।
ধ্যান বিষয়ক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় [১] এটা প্রকাশ পেয়েছে যে, এটি একটি সম্পূর্ণ বিজ্ঞানসম্মত জৈব-আধ্যাত্মিক পদ্ধতি, যা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ভারসাম্যহীনতা থেকে উদ্ভূত চাপ—তা সে বিদ্যালয়, কর্মক্ষেত্র বা বাড়ি যেখানেই হোক— প্রতিরোধ ও মোকাবিলা করতে সহায়তা করে।
সহজ যোগ ধ্যান প্রমাণ করেছে যে এটি অনন্য, কারণ এটি স্বতঃস্ফূর্ত, সহজ ও অনায়াস। সহজ যোগ ধ্যানের এই সমস্ত বৈশিষ্ট্য শিশুদের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাছেও এটিকে গ্রহণযোগ্য, উপভোগ্য ও জনপ্রিয় করে তুলেছে।
এছাড়াও, নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে মানসম্মতভাবে পাঠ্যক্রম পরিচালনা ও সম্পন্ন করার ভারী দায়িত্ব সামলাতে শিক্ষকদের জন্য এটি কাজ ও ব্যক্তিজীবনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার একটি কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।https://www.innerpeaceday.org/en/
দ্য ইনার পিস প্রজেক্ট (www.innerpeaceday.org) এবং ধ্যানধারা [২] (ভারত) এর মতো বিভিন্ন উদ্যোগ সহজ যোগ ধ্যানের মাধ্যমে সামগ্রিক স্কুল স্বাস্থ্য এবং শিশুদের জীবনের সুবিধাগুলি নিয়মিত স্কুলগুলিতে পৌঁছে দিচ্ছে।