সামগ্রিক স্বাস্থ্য

সামগ্রিক স্বাস্থ্য

সূক্ষ্ম দেহযন্ত্রের আরোগ্যবিদ্যা

অনেক দিক থেকে উপকারী হলেও, প্রচলিত চিকিৎসাব্যবস্থা প্রায়ই মনোদৈহিক এবং মানসিক রোগের গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসায় ব্যর্থ হয়। কারণ এটি মূল কারণের পরিবর্তে সাধারণত লক্ষণগুলোকেই চিকিৎসা করে এবং সমগ্র দেহ-মনকে একটি সামগ্রিক একক হিসেবে দেখার বদলে সমস্যাগুলোকে আলাদা আলাদাভাবে বিবেচনা করে।

শ্রী মাতাজী কয়েক বছর ধরে চিকিৎসাবিজ্ঞান অধ্যয়ন করেছিলেন। কিন্তু ভারতের বিভাজনের পর ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক ঘটনাবলির কারণে তিনি সেই পড়াশোনা ত্যাগ করতে বাধ্য হন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে আধ্যাত্মিকতা ও স্বাস্থ্যের মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তিনি ধ্যানের প্রতি নিজের সময় উৎসর্গ করেন এবং ধ্যান মানুষের মন ও শরীরের উপর কী প্রভাব ফেলে তা পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করেন।

এই প্রক্রিয়ায় তিনি শুধু মানবদেহকে নিয়ন্ত্রণকারী সূক্ষ্ম শক্তির নাড়ি-প্রণালী ও স্নায়ু-কেন্দ্রগুলিকে পুনরাবিষ্কারই করেননি, বরং এই ব্যবস্থাকে পুনরায় সুস্থ ও সুন্দর করে তোলার জন্য তিনি কুণ্ডলিনী শক্তি জাগরণের কথা বলেন, যা হল এক পুষ্টিদায়ক, মাতৃশক্তি, যার উল্লেখ প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্রে পাওয়া যায়। শ্রী মাতাজী মানুষের আচরণ এবং সেই আচরণের এই শক্তি ও সূক্ষ্ম ব্যবস্থার উপর কী প্রভাব পড়ে তা গভীরভাবে অধ্যয়ন করেছিলেন। তিনি দেখেছিলেন, যখন মানুষের আচরণ ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে, তখন তা শারীরিক, মানসিক বা আবেগগত চরম অবস্থার দিকে নিয়ে যেতে পারে, যার ফলে অসুস্থতা সৃষ্টি হয়।

শ্রী মাতাজী জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, যদিও এর নিরাময়মূলক উপকারিতা রয়েছে, তবুও এর মূল উদ্দেশ্য রোগ নিরাময় করা নয়; বরং আত্মসাক্ষাৎকারের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে এই শক্তি ও চেতনাকে জাগ্রত করা।

এই কুণ্ডলিনী যখন এই ছয়টি চক্রের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে, তখন সে এই চক্রগুলিকে আলোকিত করেন, পুষ্টি দেয় এবং একত্রিত করে—ফলে সামগ্রিকভাবে তুমি সুস্থ হয়ে ওঠো। এটা এমন নয় যে শরীরের একটি অংশের চিকিৎসা করা হলো আর অন্য অংশকে উপেক্ষা করা হলো, (বরং) সমগ্রতার মধ্যে, পূর্ণ ভারসাম্যের মধ্যে (সবকিছু ঠিক হয়ে যায়)। এবং সে(কুণ্ডলিনী) তোমাকে মধ্য পথে ভারসাম্যে রাখে।

তাঁর বিভিন্ন সম্মেলনে শ্রী মাতাজী এই অভ্যন্তরীণ শক্তির ব্যবস্থাকে একটি তত্ত্ব (হাইপোথিসিস) হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন। তিনি মানুষকে এটি অন্ধভাবে গ্রহণ করতে বলেননি; বরং উন্মুক্ত মন নিয়ে নিজেরা পরীক্ষা করে দেখার জন্য উৎসাহিত করেছিলেন। এর ফলস্বরূপ, সহজ যোগ অনুশীলনকারী এবং নিজেদের স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নতি প্রত্যক্ষ করা বিভিন্ন চিকিৎসক ও বিজ্ঞানী বিভিন্ন দেশে ও বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রে এই বিষয়ে গবেষণা করেছেন। এসব গবেষণার ফলাফল বিভিন্ন চিকিৎসা বিষয়ক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার একজন জেনারেল প্র্যাকটিশনার এবং সিডনির রয়্যাল হসপিটাল ফর উইমেন–এর ন্যাচারাল থেরাপিজ ইউনিটের গবেষণা ফেলো ডা. রমেশ মনোচা সহজ যোগ ধ্যানের প্রভাব সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য ফলাফল প্রকাশ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে সহজ যোগ ধ্যান উচ্চ রক্তচাপ, মেনোপজ-সংক্রান্ত সমস্যা [], স্ট্রেসজনিত উপসর্গ[], এডিএইচডি (ADHD)[] এবং হাঁপানি [.]– এর মতো বিভিন্ন সমস্যার চিকিৎসা ও প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে।ডা. মনোচার মতে, সহজ যোগ ধ্যানের সময় যে চিন্তাশূন্য অবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়, তা “শরীরের শারীরবৃত্তীয় কার্যকলাপের একটি অনন্য ধরণের সঙ্গে সম্পর্কিত।

তিনি উল্লেখ করেন যে বহু ধরনের ধ্যানপদ্ধতি ও কৌশলের মধ্যে শুধুমাত্র সহজ যোগ ধ্যানই চিকিৎসাগত প্রভাবের দিক থেকে কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে।

YouTube player

১৯৯৬ সালে শ্রী মাতাজী ভারতের মুম্বাইয়ের কাছে বেলাপুরে ইন্টারন্যাশনাল সহজ যোগ রিসার্চ অ্যান্ড হেলথ সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেন। এই কেন্দ্রটি এখনও স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছে। এখানে রোগীদের রোগ নির্ণয় এবং প্রথাগত আয়ুর্বেদিক ও অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা পদ্ধতির পাশাপাশি সহজ যোগের বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে চিকিৎসা করা হয়। এই হেলথ সেন্টারে ধ্যানভিত্তিক চিকিৎসার ফলে রোগীদের জীবনযাত্রার মানের উল্লেখযোগ্য উন্নতি, উদ্বেগ কমে যাওয়া এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে উন্নতি লক্ষ্য করা গেছে, যা প্রচলিত পশ্চিমা চিকিৎসা পদ্ধতির তুলনায় বেশি কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে।[]

শ্রী মাতাজী মানুষের সূক্ষ্ম শক্তির ব্যবস্থাকে একটি উল্টো গাছের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন—যার মূল রয়েছে মস্তিষ্কে, আর শাখা-প্রশাখা ও ফল রয়েছে শরীরে।এই শক্তি ব্যবস্থার মূল মস্তিষ্কে অবস্থিত এবং সেখান থেকে তা মহাজাগতিক আধ্যাত্মিক শক্তি গ্রহণ করে গাছের শাখা-প্রশাখাকে পুষ্টি জোগায়। ধ্যানের সময় মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম ব্যবস্থা এবং শরীরের শক্তিকেন্দ্রগুলোর মধ্যে যে অবিরাম প্রতিক্রিয়া ও যোগাযোগ ঘটে, তার ফলে ধীরে ধীরে শরীর ও মনের ভারসাম্য এবং সমন্বয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এই গাছটিকে সুস্থ ও শক্তিশালী রাখতে হলে আমাদের মনোযোগ সেই মূলের দিকে দিতে হবে, যা মস্তিষ্কে অবস্থিত। আর এটি সম্ভব সহজ যোগ ধ্যানের অনুশীলনের মাধ্যমে।

যদি একটি গাছকে চিকিৎসা করতে চাও আর তুমি (তার) পাতায় ওষুধ দিতে শুরু করো, তবে তা কখনও সুস্থ হবে না। তোমাকে তার মূলের কাছেই যেতে হবে।


১. ডা. রমেশ মনোচা ও ডা. সেমার বি. ব্ল্যাক, “পেরিমেনোপজ পর্যায়ের নারীদের জন্য সহজ যোগ ধ্যানের একটি পরীক্ষা মূলক গবেষণায, জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি ইন মেডিক্যাল সেটিংস, সেপ্টেম্বর ২০০৭; ১৪(৩): ২৬৬–২৭৩।
ই-বুক: “Silence Your Mind”, প্রকাশক: হ্যাচেট অস্ট্রেলিয়া, ২০১৩।
২. ডা. রমেশ মনোচা, ব্ল্যাক ডি., সারিস জে., স্টাফ সি। পূর্ণকালীন কর্মীদের মধ্যে কর্মস্থলের চাপ, উদ্বেগ ও বিষণ্নতার জন্য ধ্যানের একটি র‍্যান্ডমাইজড কন্ট্রোল ট্রায়াল। এভিডেন্স-বেসড কমপ্লিমেন্টারি অ্যান্ড অল্টারনেটিভ মেডিসিন। ২০১১; ২০১১: ৯৬০৫৮৩। ই-পাব: ৭ জুন ২০১১।
৩. ডা. লিন্ডা জে. হ্যারিসন, ডা. রমেশ মনোচা, ডা. কাটিয়া রুবিয়া, “অ্যাটেনশন ডেফিসিট–হাইপারঅ্যাক্টিভিটি ডিসঅর্ডার (ADHD)-এ আক্রান্ত শিশুদের জন্য পারিবারিক চিকিৎসা কর্মসূচি হিসেবে সহজ যোগ ধ্যান”, ক্লিনিক্যাল চাইল্ড সাইকোলজি অ্যান্ড সাইকিয়াট্রি, খণ্ড ৯ (৪), ২০০৪।
৪. ডা. রমেশ মনোচা, মার্কস জি. বি., কেনচিংটন পি., পিটার্স ডি. প্রমুখ। “মাঝারি থেকে গুরুতর হাঁপানি নিয়ন্ত্রণে সহজ যোগের ব্যবহার: একটি র‍্যান্ডমাইজড কন্ট্রোল্ড ট্রায়াল”, থোরাক্স জার্নাল, ফেব্রুয়ারি ২০০২; ৫৭(২): ১১০–১১৫।
৫. শেং-চিয়া চুং (পিএইচডি), মারিয়া এম. ব্রুকস (পিএইচডি), মধুর রায় (এমডি), জুডিথ এল. বাল্ক (এমডি, এমপিএইচ), সন্দীপ রায় (এমডি): “সহজ যোগ ধ্যানের প্রভাব: জীবনযাত্রার মান, উদ্বেগ এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের উপর”, দ্য জার্নাল অব অল্টারনেটিভ অ্যান্ড কমপ্লিমেন্টারি মেডিসিন, খণ্ড ১৮, সংখ্যা ৬, ২০১২।