স্যার সি.পি. শ্রীবাস্তব

স্যার সি.পি. শ্রীবাস্তব

স্যার সি.পি. এবং 'ডিমিনুটিভ কলোসাস'

শ্রী মাতাজী নির্মলা দেবী সারা বিশ্বে সহজযোগের অনুপ্রেরণাদায়ী শক্তি হিসেবে পরিচিত। একজন আধ্যাত্মিক নেত্রী হিসেবে তাঁর খ্যাতির পাশাপাশি আরেকটি সমান্তরাল গল্প রয়েছে: তাঁর স্বামী স্যার চন্দ্রিকা প্রসাদ শ্রীবাস্তবের অসাধারণ কর্মজীবন।

যাঁরা ব্যক্তিগতভাবে শ্রী মাতাজীর সঙ্গে সময় কাটানোর সৌভাগ্য পেয়েছেন, তাঁরা নিশ্চয়ই সেই লম্বা, মর্যাদাবান ও মৃদুভাষী ব্যক্তিত্বটির সঙ্গেও পরিচিত ছিলেন—যাঁকে স্নেহভরে ‘স্যার সি.পি.’ নামে ডাকা হতো।

শ্রী মাতাজী এবং তাঁর পাশে দুই কন্যা, কল্পনা ও সাধনার সাথে স্যার সিপি তাঁর নাইটহুড প্রদর্শন করছেন
শ্রী মাতাজী এবং তাঁর পাশে দুই কন্যা, কল্পনা ও সাধনার সাথে স্যার সিপি তাঁর নাইটহুড প্রদর্শন করছেন

স্যার সি.পি. একজন বিশিষ্ট রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন। তিনি জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার মহাসচিব হিসেবে পরপর চারটি মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন, এবং এই সময়েই রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ তাঁকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করেন।

স্যার সি.পি. এবং শ্রী মাতাজীর বিয়ে হয়েছিল যখন তিনি ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের একজন তুলনামূলকভাবে অল্পপরিচিত তরুণ কর্মকর্তা ছিলেন, এবং তিনি প্রায়ই উল্লেখ করেছেন যে তাঁর দ্রুত পেশাগত সাফল্যের বড় অংশই তাঁর স্ত্রীর পরামর্শ ও অন্তর্দৃষ্টি অনুসরণ করার ফল।

বিয়ের কিছুদিন পরেই তাঁকে একটি ঈর্ষণীয় সুযোগ দেওয়া হয়—তিনি চাইলে হয় অভিজাত ভারতীয় প্রশাসনিক পরিষেবায় যোগ দিতে পারতেন, নয়তো সমানভাবে—বরং আরও বেশি—মর্যাদাপূর্ণ কূটনৈতিক পরিষেবায় যোগ দিতে পারতেন। তাঁর বন্ধুরা তাঁকে কূটনীতিক হতে উৎসাহিত করেছিলেন, কারণ তাতে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর রাষ্ট্রদূত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল।

কিন্তু শ্রীবাস্তব মহাশয়া এক মুহূর্ত দ্বিধা না করে বলেছিলেন, “না, আমরা দেশের মধ্যেই থাকি। এখানেই আমাদের দেশকে সেবা করি।” এরপর কী ঘটবে তা কেউই অনুমান করতে পারেনি। একের পর এক অপ্রত্যাশিত ঘটনার মাধ্যমে স্যার সি.পি. ভারতের প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে নিযুক্ত হন।

YouTube player

পরে ফিরে তাকালে দেখা যায়, এটি একটি সৌভাগ্যজনক ঘটনা ছিল, কারণ মিঃ শাস্ত্রী অনেক দিক থেকেই সেই সহজ দর্শনের প্রকৃত প্রতিমূর্তি ছিলেন, যা শ্রী মাতাজী ধারণ করতেন এবং যা তিনি পরবর্তীকালে সারা বিশ্বের মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নেন। সরকারি দায়িত্ব থেকে অবসর নেওয়ার পর স্যার সি.পি., আবারও তাঁর স্ত্রীর উৎসাহে, ''Lal Bahadur Shastri: A Life of Truth in Politics''গ্রন্থটি লেখেন। এতে তিনি মিঃ শাস্ত্রীকে হিন্দু দেবতা শ্রী রামের বহু গুণের অধিকারী হিসেবে বর্ণনা করেছেন—নম্রতা ও সকল মানুষের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, যার সঙ্গে যুক্ত ছিল মহান সম্মানবোধ ও কর্তব্যনিষ্ঠা।

স্যার সি.পি. লিখেছেন যে মিঃ শাস্ত্রী “সত্যিই ধর্ম, ন্যায়, সত্য এবং নৈতিকতার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত ছিলেন। তাঁর মধ্যে কোনো ভান ছিল না। কোনো দ্বৈততা ছিল না। ভেতরের একজন শাস্ত্রী আর বাইরের একজন শাস্ত্রী আলাদা ছিলেন না। তিনি সম্পূর্ণ এক ছিলেন—ভেতরে এক, বাইরেও এক; ভেতরে সুন্দর, বাইরেও সুন্দর।”

মিঃ শাস্ত্রী তাঁর অত্যন্ত ক্ষীণ দেহ, ছোটখাটো চেহারা এবং বিনয়ী আচরণের কারণে অনেকের মনে এমন ধারণা জন্ম দিয়েছিলেন যে তাঁকে সহজেই প্রভাবিত করা যেতে পারে।

মিঃ শাস্ত্রী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কিছুদিন পরই পাকিস্তান কাশ্মীর আক্রমণ করে। মিঃ শাস্ত্রীর প্রতিক্রিয়া ছিল, “আমি একজন শান্তিপ্রিয় মানুষ, কিন্তু আমি একজন সম্মানিত মানুষ। দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশকে রক্ষা করা আমার কর্তব্য।”

স্যার সি.পি.-র ভাষায়, “এই শান্তির মানুষটি এক মহীরুহের মতো দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে উঠেছিলেন।”

স্যার সি.পি. নৌবাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে, লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন
স্যার সি.পি. নৌবাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে, লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন
“লাল বাহাদুর শাস্ত্রী সম্পূর্ণ এক ছিলেন—ভেতরে এক, বাইরেও এক; ভেতরে সুন্দর, বাইরেও সুন্দর।”
স্যার সি.পি. শ্রীবাস্তব, ডিসেম্বর ১৯৯৪

এই ক্ষেত্রে মিঃ শাস্ত্রী সেই মশাল বহন করছিলেন যা প্রথম প্রজ্বালিত করেছিলেন মহাত্মা গান্ধী। তিনি আরও বলেন, “ভারতের বিশেষত্ব হলো এখানে হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান, শিখ, পারসি এবং অন্যান্য সব ধর্মের মানুষ রয়েছে,কিন্তু আমরা এসব বিষয়কে রাজনীতিতে নিয়ে আসি না। এটাই ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে পার্থক্য। যেখানে পাকিস্তান নিজেকে একটি ইসলামিক রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করে এবং ধর্মকে রাজনৈতিক উপাদান হিসেবে ব্যবহার করে, সেখানে আমরা ভারতীয়রা যে কোনো ধর্ম অনুসরণ করার স্বাধীনতা পাই এবং নিজেদের ইচ্ছামতো উপাসনা করতে পারি। কিন্তু রাজনীতির ক্ষেত্রে আমরা প্রত্যেকেই সমানভাবে ভারতীয়।”

পরবর্তী শান্তি আলোচনার সময় মিঃ শাস্ত্রী বিরোধী পক্ষের সকলকেই তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির পক্ষে রাজি করাতে সক্ষম হন, এবং একসঙ্গে তারা পাকিস্তানের সঙ্গে একটি স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন। একই শান্তি আলোচনার সময়ই মিঃ শাস্ত্রী হঠাৎ পরলোকগমন করেন, সম্ভবত হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে। তিনি যখন মৃত্যুবরণ করেন তখন স্যার সি.পি. তাঁর পাশেই ছিলেন। পরে তিনি লিখেছিলেন যে “শ্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর সেবা করার সুযোগ পাওয়ার চেয়ে বড় কোনো সৌভাগ্য তিনি কখনও অনুভব করেননি।”[]

লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর মহান ব্যক্তিত্বের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে এবং তাঁর স্ত্রীর সক্রিয় সহায়তা ও সমর্থনে স্যার সি.পি. নিজের উজ্জ্বল কর্মজীবন শুরু করেন—প্রথমে ভারতীয় প্রশাসনিক পরিষেবার একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে, তারপর ইন্ডিয়ান শিপিং কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে, এবং শেষ পর্যন্ত জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার ইতিহাসে সর্বাধিক সময় দায়িত্ব পালনকারী মহাসচিব হিসেবে।

আইএমও হলো জাতিসংঘের একমাত্র সংস্থা যার সদর দপ্তর লন্ডনে অবস্থিত, এবং স্যার সি.পি. সেখানে ষোল বছর ধরে কর্মরত থাকাকালীন সময়েই শ্রী মাতাজী প্রথম সহজযোগ ধ্যানকে বিশ্বের কাছে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে কাজ শুরু করেন।

সুইডেনের মালমোতে অবস্থিত ওয়ার্ল্ড মেরিটাইম ইউনিভার্সিটিতে শ্রী মাতাজী এবং স‍্যার সি.পি
সুইডেনের মালমোতে অবস্থিত ওয়ার্ল্ড মেরিটাইম ইউনিভার্সিটিতে শ্রী মাতাজী এবং স‍্যার সি.পি

১. ^ সি. পি. শ্রীবাস্তব, 'Lal Bahadur Shastri: A Life of Truth in Politics', নিউ দিল্লি: অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৯৫।