প্রসারিত বৃত্ত

প্রসারিত বৃত্ত

পরিবর্তনের সূচনা

১৯৬৪ সালের ২৭শে মে, ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর পরলোকগমন করেন। স্যার সি. পি. তখন যুক্তরাজ্যে একটি শিপিং সম্মেলনে অংশগ্রহণ করছিলেন।মঙ্গলবার, ২ জুন, খবর আসে যে লাল বাহাদুর শাস্ত্রী কংগ্রেস পার্টির নতুন নেতা হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন এবং শীঘ্রই তিনি ভারতের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ।

স্যার সি. পি. যখন যুক্তরাজ্য থেকে মুম্বাইয়ে ফিরে এলেন, তখন সংবাদপত্রে খবর প্রকাশিত হচ্ছিল যে লাল বাহাদুর শাস্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।শ্রী মাতাজী তাঁর স্বামীকে অবিলম্বে নিউ দিল্লি যেতে এবং শাস্ত্রীজিকে তাঁর সেবা ও সহযোগিতা দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন।তিনি দৃঢ়ভাবে অনুভব করেছিলেন যে, যেহেতু লাল বাহাদুর শাস্ত্রী তাঁর স্বামীর ওপর আস্থা রাখতেন, তাই যতটা সম্ভব তাঁকে সহায়তা করা তাঁর কর্তব্য।

কয়েক দিন পরে, স্যার সি.পি যখন নিউ দিল্লিতে একটি সভায় যোগদান করতে গিয়েছিলেন,তখন চিকিৎসারত শাস্ত্রীজির সাথে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন।

এই সৌভাগ্যপূর্ণ সাক্ষাতের সময়ই লাল বাহাদুর শাস্ত্রী শ্রী মাতাজীর স্বামীকে অনুরোধ করেছিলেন যে তিনি যেন প্রধানমন্ত্রীর যুগ্ম সচিব হিসেবে তাঁর পাশে থেকে ভারতের সেবায় কাজ করেন।

শ্রী মাতাজী মুম্বাইতে লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর সাথে অতিথিদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন
শ্রী মাতাজী মুম্বাইতে লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর সাথে অতিথিদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন

তাঁর জীবনী “Lal Bahadur Shastri: A Life of Truth in Politics” গ্রন্থে স্যার সি. পি. স্মরণ করে লিখেছেন,“যখন আমরা দু’জনে প্রধানমন্ত্রী শাস্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে যেতাম, তখন তিনি প্রায়ই তাঁর সঙ্গে সাধু-সন্ত, ধর্ম এবং আধ্যাত্মিকতা নিয়ে আলোচনা করতেন যে বিষয়গুলিতে তাঁর গভীর জ্ঞান ছিল।তিনি এমনকি নির্মলাকে ভারতীয় কংগ্রেস পার্টিতে যোগ দেওয়ার জন্যও উৎসাহিত করেছিলেন। তবে নির্মলা রাজনীতির চেয়ে আধ্যাত্মিকতার প্রতিই বেশি আগ্রহী ছিলেন এবং রাজনীতিতে তাঁর তেমন ঝোঁক ছিল না।”

বছরের পর বছর ধরে, যখন তাঁর স্বামী রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যস্ত ছিলেন, তখন শ্রী মাতাজী নীরবে একজন সমাজসেবী হিসেবে কাজ করে গেছেন। মহারাষ্ট্রের চন্দ্রপুরের কাছে একটি আরোগ্যনিবাস জন্য তিনি অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন। তিনি ‘ফ্রেন্ডস অব দ্য ব্লাইন্ড’ নামে একটি সংস্থার সভাপতিও হয়েছিলেন। মীরাটে তিনি একটি শরণার্থী নিবাস এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য একটি আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন করেন, এবং একটি বড় কুষ্ঠরোগী আশ্রমের কাজেও সহায়তা করেছিলেন।

১৯৬৯ সালের অক্টোবর মাসে মুম্বাইয়ে শ্রী মাতাজীর বড় মেয়ে কল্পনার সঙ্গে প্রভাত শ্রীবাস্তবের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়।

মেয়ে কল্পনার বিয়েতে শ্রী মাতাজী
মেয়ে কল্পনার বিয়েতে শ্রী মাতাজী
মেয়ে কল্পনার বিয়েতে স্যার সিপি ও জামাই প্রভাতের সাথে শ্রী মাতাজী
মেয়ে কল্পনার বিয়েতে স্যার সিপি ও জামাই প্রভাতের সাথে শ্রী মাতাজী

১৯৭০ সালের অক্টোবর মাসের শুরুতে শ্রী মাতাজীর মা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। মায়ের সঙ্গে দেখা করার জন্য তিনি বিদেশ সফর থেকে ফিরে আসেন এবং আশ্চর্যজনকভাবে দেখেন যে তাঁর মা বেশ প্রফুল্ল মেজাজে আছেন।তাঁর মা তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, তাঁর বাবা যে বিষয়টি খুঁজে পেতে বলেছিলেন, তিনি কি তা খুঁজে পেয়েছেন। তখন শ্রী মাতাজী তাঁকে জানান যে তিনি সমষ্টিগতভাবে আত্মসাক্ষাৎকার লাভের পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন।১৯৭০ সালের ১১ অক্টোবর, রবিবার, তাঁর মা কর্নেলিয়া করুণা সালভে নাগপুরে পরলোকগমন করেন।

শীঘ্রই তারপর, শ্রী মাতাজীকে প্যারিসের উদ্বোধনী এয়ার ইন্ডিয়া ফ্লাইটে আমন্ত্রণ জানানো হয়,এর পর তিনি তেহরানে যান তাঁর ছোট ভাই এইচ.পি. সালভেকে দেখতে,তিনি তখন এয়ারলাইনের পক্ষ থেকে সেখানে কর্মরত ছিলেন।[]

তাঁর সাথে সময় কাটানোর সময়, এইচ.পি. ধীরে ধীরে উপলব্ধি করতে পারলেন যে তাঁর দিদির মধ্যে কোনো পরিবর্তন এসেছে। প্রকৃতপক্ষে, ততদিনে ভারতে তাঁর প্রায় ১২ জন অনুসারী তৈরি হয়েছিল যারা শ্রী মাতাজীকে শিক্ষক এবং গুরু হিসেবে গ্রহণ করতে আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন।

তাঁর ভাইকে এই কথা প্রকাশ করার পর যে—১৯৭০ সালের ৫ই মে, মঙ্গলবার, তিনি সত্যিই এক শক্তিশালী রূপান্তরের অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন—শ্রী মাতাজী তাঁর ভাইয়ের কয়েকজন আধ্যাত্মিকতার বিষয়ে আগ্রহী বন্ধুকে আত্মসাক্ষাৎকার দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।শিরাজ ভ্রমণ থেকে তেহরানে ফিরে আসার পর, এইচ.পি. সালভে কয়েকজন বন্ধুকে ফোন করে শ্রী মাতাজীর সঙ্গে একটি নৈশভোজসহ আধ্যাত্মিক সভার আয়োজন করলেন।পরের দিন প্রায় কুড়ি জন বন্ধু, যাদের মধ্যে কয়েকজন সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি ছিলেন, তাঁর বাড়িতে নৈশভোজে আসেন এবং আরও বিশেষভাবে সেখানে তাঁদের আধ্যাত্মিক জাগরণ লাভের সুযোগ হয়।

এইচ. পি. সালভে স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, "একজন ভদ্রলোক, ডা. দিওয়ান, আত্মসাক্ষাৎকার লাভ করার পর তাঁর মাথার ওপরের দিক থেকে যেন চন্দনের সুগন্ধ বেরোতে শুরু করেছিল। আমি বেশ আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলাম—এত দূরে বসে শ্রী মাতাজী কীভাবে কারও শরীরের মধ্যে এমন সুগন্ধ সঞ্চার করতে পারেন!এদিকে এক পারসি ভদ্রমহিলা, যিনি তীব্র আর্থ্রাইটিসে ভুগছিলেন বলে কেবল ভর দেওয়ার লাঠিতে ভর দিয়ে এসেছিলেন, আত্মসাক্ষাৎকার লাভের পর যখন ফিরে গেলেন, তখন তিনি আর ভর দেওয়ার লাঠি ব্যবহার করলেন না। পরের দিন তাঁকে নিজের গাড়ি চালাতেও দেখা গিয়েছিল।”

পরদিন তেহরানের শীর্ষস্থানীয় ইংরেজি সংবাদপত্রগুলো এই ঘটনাটিকে সংবাদ হিসেবে ছাপে এবং তারা জানায় যে যা ঘটেছিল তার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। এর পর অনেক মানুষ শ্রী মাতাজীকে দেখার জন্য ভিড় করতে শুরু করেন। তাঁর ভাইয়ের ভাষায়, “তাঁর জনপ্রিয়তা এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে তিনি যখন প্রথম তেহরানে এসেছিলেন, তখন আমি তাঁকে আমার বোন হিসেবে অন্যদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতাম; কিন্তু যখন তিনি তেহরান ছেড়ে চলে গেলেন, তখন লোকেরা আমাকে তাঁর ভাই হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিত।”কিছুদিনের মধ্যেই এইচ. পি. সালভেকে ‘বাবামামা’ বলে সম্বোধন করা শুরু হয়—যা স্নেহপূর্ণভাবে ‘মায়ের ভাই’ অর্থে ব্যবহৃত একটি সম্বোধন।

“আমরা যে সবচেয়ে সুন্দর জিনিসটি অনুভব করতে পারি তা হলো অলৌকিক। এটিই সকল প্রকৃত শিল্প ও বিজ্ঞানের উৎস।"
আলবার্ট আইনস্টাইন

১. ^ এইচ. পি. সালভে, 'আমার স্মৃতিকথা' নয়াদিল্লি: লাইফ ইটারনাল ট্রাস্ট, ২০০০।