Agnya Chakra

আজ্ঞা চক্র

ক্ষমা করার শক্তি

এই চক্রের মূল তত্ব হল 'ক্ষমাশীলতা'। যখন আমরা ক্ষমা করি না, তখন আমাদের এই চক্রের ভারসাম্য নষ্ট হয়, যার ফলস্বরূপ আমরাই নিজেদের ক্ষতি সাধন করে থাকি। ক্ষমাশীলতা আমাদেরকে অন্যের প্রতি ক্রোধ ও ঘৃণার ভাব থেকে মুক্তি দেয় । আত্ম-সাক্ষাৎকার লাভের পূর্বে ক্ষমা করতে পারা সহজ নয়। আত্ম-সাক্ষাৎকার লাভের পরে হৃদয় থেকে কেবল "আমি ক্ষমা করলাম" এটুকু বলার মাধ্যমেই, আমাদের কুণ্ডলিনী শক্তি আজ্ঞা চক্রকে ভেদ করে আমাদের চিত্তকে পরমাত্মার সাম্রাজ্যে পৌঁছে দিতে পারে। এর ফলে আমরা সহজেই ধ্যানের মধ্যে নির্বিচার সচেতনতার স্থিতিতে প্রবেশ করতে পারি।

ক্ষমাশক্তির মাধ্যমে, আমাদের ভিতরের দৈব গুণাবলীর প্রকাশ ঘটে, যেমন - নম্রতা, উদারতা এবং সকলের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও মমতা। নিয়মিত ধ্যানের মাধ্যমে যখন আমাদের আজ্ঞাচক্র পরিপক্কতা লাভ করে তখন আমাদের ভিতরের সমস্ত অহংকার, কন্ডিশনিং, অপ্রয়োজনীয় অভ্যাস, বর্ণবাদের ভুল ধারণা এবং আমাদের সমস্ত মিথ্যা পরিচয়গুলো ইত্যাদি ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যেতে থাকে। প্রাচীন ধর্মগ্রন্থে এটিকে এক সংকীর্ণ পথ রূপে বর্ণনা করা হয়েছে যা মানুষের চেতনাকে তার চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছতে সাহায্য করে - সহস্রার চক্র হল আমাদের আধ্যাত্মিক রাজ্যের প্রতীক, আজ্ঞাচক্র আমাদের সেইখানে পৌঁছানোর পথ খুলে দেয়।

অবস্থান:
আজ্ঞাচক্র আমাদের মস্তিষ্কে অপটিক স্নায়ু তন্তুগুলোর (চিকিৎসা পরিভাষায় অপটিক চিয়াসমা বলা হয়) সংযোগস্থলে অবস্থিত, যা প্রায় আমাদের কপালের কেন্দ্রবিন্দু । আজ্ঞাচক্রের চৈতন্য লহরী আমাদের উভয় হাতের অনামিকা আঙ্গুলে অনুভব করা যায়।

বর্ণ বা রং:
রূপালী রঙ আজ্ঞা চক্রের প্রতিনিধিত্ব করে। এই চক্র আলোক তত্বের সাথে সম্পর্কিত ।

আজ্ঞা চক্রের গুণাবলী :

• ক্ষমা
• করুণা
• বিনম্রতা
• নির্বিচারিতা
• অহংকার এবং অতি-অহংকার

আজ্ঞাচক্রের প্রাথমিক গুণ হল ক্ষমা। এই চক্রের জাগরণের মাধ্যমেই আমরা নিজেদের এবং অন্যদের ক্ষমা করার মতো বিশেষ ক্ষমতা লাভ করি। আজ্ঞাচক্রকে "তৃতীয় নয়ন" হিসাবেও আখ্যায়িত করা হয়। অন‍্যান‍্য যোগ অনুশীলনকারীরা সাধারণত দাবি করে থাকেন যে এই "তৃতীয় নয়নের" বিশেষত্ব, গূঢ় ধরনের ছবি দেখা বা অতীন্দ্রিয় জ্ঞান (clairvoyant) ক্ষমতা অর্জন; কিন্তু আসল বিষয়টি একেবারেই ভিন্ন । আমরা সাধারণত চারপাশের পৃথিবীকে মানসিক ও আবেগগত পক্ষপাতের দৃষ্টিতে দেখি, আমাদের তৃতীয় নয়নের উন্মোচন এই দীর্ঘদিনের অভ‍্যস্ত দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটায় । যে জীবনটি আগে চাপপূর্ণ, একঘেয়ে বা অর্থহীন বলে মনে হতো, আত্ম-উপলব্ধি এবং আজ্ঞা চক্রের উন্মোচনের পর তা আনন্দ, প্রেম এবং করুণায় ভরে ওঠে, কারণ তখন আমরা আমাদের জন্মের প্রকৃত উদ্দেশ্য উপলব্ধি করি। সম্পদ বা অভাব—কোনোটাই তখন আমাদের উত্তোলিত বা নিরাশ করতে পারে না, কারণ আমরা আমাদের আধ্যাত্মিক স্বভাবের বাস্তবতায় স্থির হয়ে যাই । এই উচ্চতর জগতে পৌঁছানো আমাদের বুঝতে সাহায্য করে কেন গৌতম বুদ্ধ বোধিলাভের পর আর কখনো তাঁর প্রাসাদের আরামে ফিরে যাওয়ার প্রয়োজন অনুভব করেননি।

অভিজ্ঞতা এবং উপকারিতা :
আজ্ঞাচক্র আমাদের দৃষ্টি, শ্রবণ, চিন্তা, এমনকি পিটুইটারি গ্রন্থিকেও নিয়ন্ত্রণ করে । এই অত্যাবশ্যক গ্রন্থিটি, যা ‘মাস্টার গ্রন্থি’ নামেও পরিচিত, অন্যান্য সব অন্তঃস্রাবী গ্রন্থিকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং আমাদের বৃদ্ধি, শারীরবৃত্তীয় পরিপক্বতা, বিপাক এবং নিদ্রাকে প্রভাবিত করে। আমাদের অনেকেই চাকরির অংশ হিসেবে দীর্ঘ সময় কম্পিউটারের সামনে কাটাই। আমরা টেলিভিশনের সামনে-ও অনেক সময় ব্যয় করি। চোখে অতিরিক্ত উদ্দীপনা সৃষ্টি করলে তা আজ্ঞাচক্রকে দুর্বল করে। সৌভাগ্যবশত, নিয়মিত সহজযোগ ধ্যানচর্চা এই সমস্যাকে উপশম করতে পারে। আমাদের বাম
আজ্ঞা , মস্তিষ্কের সুপারইগো অংশের সাথে যুক্ত থাকে , যা আমাদের স্মৃতি, অভিজ্ঞতা, অভ্যাস এবং আবেগ ধরে থাকে । আমাদের ডান আজ্ঞা মস্তিষ্কের ইগো অংশের সাথে যুক্ত, যা চিন্তা, পরিকল্পনা এবং কর্মের মাধ্যমে ভবিষ্যতের দিকে মনোনিবেশ করে। ইগো এবং সুপারইগো আজ্ঞাচক্রের মধ্যে এসে মিলিত হয়।

যদি আপনার বাম অজ্ঞা অতিমাত্রায় সক্রিয় হয়, তবে আপনার সুপারইগো বেলুনের মতো ফুলে উঠতে পারে। অতীতের ওপর অতিরিক্ত মনোযোগ অত্যন্ত আবেগপ্রবণ স্বভাব এবং আত্ম-ক্ষতিকর চিন্তা বা আচরণের দিকে নিয়ে যেতে পারে। একইভাবে, যদি আপনার ডান আজ্ঞা অতিমাত্রায় সক্রিয় হয়, তবে অতিরিক্ত চিন্তা ও পরিকল্পনার ফলে আপনার ইগো বেলুনের মতো ফুলে উঠবে। এর ফলে অস্থিরতা, প্রায়ই রাগে ফেটে পড়া এবং অন্যদের প্রতি আক্রমণাত্মক আচরণও দেখা দেয়।

সৌভাগ্যবশত, কুণ্ডলিনী শক্তি দিয়ে আজ্ঞাচক্রকে পূর্ণ করা, ইগো আর সুপার ইগোর বেলুনগুলিকে স্বাভাবিক আকারে আনতে অত্যন্ত কার্যকর । ধ্যান থেকে যে মানসিক নীরবতা আসে, তা আমাদের সবার মধ্যে বিনয় প্রতিষ্ঠা করে। বিনয়ের মাধ্যমে আমরা ক্ষমার শক্তি লাভ করি। ক্ষমা হলো গ্রহণযোগ্যতা ও আরোগ্যের প্রক্রিয়া। এটি আপনাকে রাগ, ঘৃণা এবং ক্ষোভের নেতিবাচক বন্ধন থেকে মুক্তি দেয়। ক্ষমা করতে শেখার মাধ্যমে আপনি গভীর শান্তি ও স্বস্তির এক অসাধারণ অনুভূতি লাভ করতে পারেন।

স্ব-মূল্যায়ন বা আত্ম-পর্যালোচনা:
যদি আপনার আজ্ঞাচক্র ব্লক হয়ে যায় বা অবরুদ্ধ থাকে, তাহলে আপনি নিজেকে বা অন্যকে ক্ষমা করতে অক্ষমতা অনুভব করতে পারেন। আপনি বেশি অতীত নিয়ে ভাবতে বা আত্ম-করুণায় ডুবে থাকতে পারেন। অহংকার এবং আক্রমণাত্মকতা, সেইসাথে পর্নোগ্রাফি বা বিভ্রান্তিকর যৌন কল্পনার প্রতি আচ্ছন্নতা আজ্ঞাচক্রের ভারসাম্যহীনতার অন্যতম লক্ষণ। অতিরিক্ত উদ্বেগ, চিন্তাভাবনা এবং পরিকল্পনাও আজ্ঞাচক্রে বাধার ইঙ্গিত দেয়।

ভারসাম্যহীনতার কারণ:

  • কঠোর মনোভাব বা অনমনীয় ধারণা পোষণ করা।
  • আচরণে বৈচিত্র্যের অভাব, একই ধরনের অভ্যাসগত আচরণ।
  • আমাদের কর্মকাণ্ডে চরমপন্থা অবলম্বন করা।

কিভাবে ভারসাম্য বজায় রাখবেন:
আজ্ঞাচক্রের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য, প্রাকৃতিক পরিবেশে ধ্যানের অনুশীলন করুন। বাইরে আকাশের দিকে তাকিয়ে ধ্যান করার চেষ্টা করুন। আপনি চাইলে ডান হাতটি কপালে রেখে মাথা সামান্য নিচু করে বলতে পারেন: “আমি সবাইকে ক্ষমা করি, নিজেকেও ক্ষমা করি।” হৃদয় থেকে এই ক্ষমার অনুভূতিটি প্রকাশ করার চেষ্টা করুন।

আজ্ঞাচক্রকে ভারসাম্যপূর্ণ রাখার সর্বোত্তম উপায় হল অতিরিক্ত চিন্তাভাবনা এবং পরিকল্পনা এড়িয়ে চলা। বর্তমানের মধ্যে বেঁচে থাকুন - এবং প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করুন!