কুণ্ডলিনী শক্তি

কুণ্ডলিনী শক্তি

ভালোবাসার বিবর্তন শক্তি

আমি দেখেছিলাম আদি কুণ্ডলিনী উত্থিত হচ্ছেন একটি বিশাল অগ্নিকুণ্ডের মত এবং অগ্নিকুণ্ডটি ছিল অত্যন্ত নিঃস্তব্ধ কিন্তু তাঁর ছিল প্রজ্জ্বলিত রূপ; যেন তুমি কিছু ধাতুকে উত্তপ্ত করেছ এবং সেটার বহু রং রয়েছে, ঠিক তেমনই কুণ্ডলিনী একটি বিশাল অগ্নিকুণ্ডের মত প্রকাশিত হচ্ছে, তোমরা বলতে পার, একটা অগ্নিকুণ্ড যা এক সুড়ঙ্গের মত, যেখানে তোমরা দেখ সেই কেন্দ্র যেখানে বিদ্যুৎ তৈরীর জন্য কয়লাকে জ্বালানো হয় এবং এটি প্রসারিত হচ্ছে দূরবীক্ষণের মত একটার পর একটা, এটা বেরিয়ে আসছে সুট, সুট, সুট-এর মত করে।

শ্রী মাতাজীর কুণ্ডলিনী জাগরণের সহজাত আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা এবং আমাদের সূক্ষ্ম তন্ত্রের উপর এর গূঢ় ক্রিয়াকলাপ সহজ যোগ ধ্যানের মূল ভিত্তি, যা তিনি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কুণ্ডলিনীর বিষয়ে এক পরমজ্ঞানী গুরুর ন‍্যায় তিনি বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন যে কীভাবে কুণ্ডলিনী ভ্রূণ গঠনের একেবারে প্রারম্ভিক স্তরেই আমাদের শরীরে প্রবেশ করে। তিনি আরও ব‍্যাখ‍্যা করেন যে এটি একটি ঐশ্বরিক ক্রিয়া, ঐশ্বরিক প্রেমের শক্তি, যা আমাদের স্বাধীনতাকে সম্মান করে এবং আমাদের স্বাধীন ইচ্ছায় কখনও হস্তক্ষেপ করে না।

শুধুমাত্র পরম সত্যকে অনুভব করার শুদ্ধ ইচ্ছাই আমাদের চেতনায় এই আধ্যাত্মিক শক্তির জাগরণ ঘটাতে সক্ষম, যা আমাদেরকে আত্ম-সাক্ষাৎকার লাভ করতে সহায়তা করে।

স্যাক্রাম অস্থি হল আমাদের মেরুদণ্ডের গোড়ায় অবস্থিত বৃহৎ, ত্রিকোণাকার একটি হাড়। প্রতিটি মানুষের মধ্যে মাতৃরূপী এই শক্তি সূক্ষ্ম ভাবে স্যাক্রাম অস্থিতে অবস্থিত। এই শক্তি সংস্কৃত ভাষায় "কুণ্ডলিনী" নামে পরিচিত, কারণ এটি সাড়ে তিন পাকে কুণ্ডলীকৃত অবস্থায় স‍্যাক্রাম অস্থিতে অবস্থান করে। যখন কুণ্ডলিনী জাগ্রত হয় তখন এটি মেরুদণ্ডের মধ্য দিয়ে উঠে আসে এবং আমাদের ভিতরে থাকা শক্তি কেন্দ্র অর্থাৎ চক্রগুলিকে ভেদ করে অবশেষে মাথার ব্রহ্মতালু দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। মাথার এই অংশ শিশু অবস্থায় খুব নরম থাকে। যখন কুণ্ডলিনী ব্রহ্মরন্ধ্রকে ছেদ করে তখন আমরা এটিকে মৃদু শীতল বাতাসের মতো অনুভব করি, যেন এটি একটি ঝর্ণার স্রোতের মত আমাদের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে।

কুণ্ডলিনী হল ঈশ্বরের চিরন্তন প্রেমশক্তির এক প্রতিফলন, যা সমগ্র সৃষ্টির উৎস। এটি সেই সর্বব্যাপী শক্তি, যা চিন্তা করে, বোঝে, সমন্বয় সাধন করে, একসাথে কাজ করে এবং সবকিছুকে সুষমভাবে বিকশিত করে—অতি ক্ষুদ্র পরমাণু কণা থেকে শুরু করে এককোষী জীব পর্যন্ত।”

Chakra Charts_BN_Page_01_Image_0001
Sacrum

শ্রী মাতাজী উল্লেখ করেছেন যে, কুণ্ডলিনী সম্পর্কে জ্ঞান বহুদিন ধরে নির্দিষ্ট কিছু যোগসম্প্রদায়, যেমন নাথপন্থীদের মধ্যে গোপনে সংরক্ষিত ছিল, তা সত্ত্বেও প্রাচীন বহু সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্যে কুণ্ডলিনী শক্তির কথা উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন, প্রাচীন লিপিতে উল্লেখ রয়েছে মেরুদণ্ডের শেষ প্রান্তের ত্রিকোণাকার হাড়ের কথা যেখানে কুণ্ডলিনী শক্তি সুপ্ত অবস্থায় থাকে, যাকে বলা হয় "ওস স্যাক্রাম"। এর অর্থ হল পবিত্র এবং এটি প্রাচীন গ্রীক "হাইরন অস্টিওন" থেকে সরাসরি অনুবাদ হয়ে এসেছে। এছাড়াও প্রাচীন মিশরীয় সংস্কৃতিতে উল্লেখ রয়েছে, যেখানে এই হাড়টিকে পুনরুত্থান এবং কৃষির পবিত্র দেবতা ওসিরিস বলে মান‍্য করা হত। গীতসংহিতা ৩৪:২০ বাইবেলেও এই পবিত্র হাড়ের উল্লেখ পাওয়া যায়। "ক্যাডুসিয়াস" চিহ্নটি মধ্যযুগীয় ইউরোপে আলক‍েমি এবং ফার্মেসির প্রতীক হয়ে উঠেছে তাতে দেখা যায় যে দুটি সর্প একটি মেরুতে সাতবার সর্পিলাকারে পেঁচিয়ে আছে। অনেক প্রাচীন শিল্পকর্মে কুণ্ডলিনীর সাড়ে তিন সর্পিল রূপ দেখা গেছে। এই সমস্ত তথ্য ইঙ্গিত দেয় যে ঐতিহাসিক সময়কাল ধরেই মানুষ এই সূক্ষ্ম শক্তির সঙ্গে পরিচিত ছিল।

YouTube player

কুণ্ডলিনী জাগরণ বিপজ্জনক বা ক্ষতিকারক ইত্যাদি মিথ্যা ধারণার বিষয়েও শ্রী মাতাজী স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন। তিনি সুন্দর এক উপমা দিয়ে বলেছেন যে, কুণ্ডলিনী হচ্ছেন আমাদের মা। বহু জন্ম জুড়ে ধৈর্য সহকারে কুণ্ডলিনী-মা আমাদের ভিতরে অপেক্ষা করতে থাকেন যতক্ষণ না পর্যন্ত আমাদের ভিতরে এই আত্ম-উপলব্ধি পাওয়ার শুদ্ধ ইচ্ছা প্রবল হয়। পৃথিবীর কোনোও জীবের ক্ষেত্রে এমন হয় না যে একজন মা তাঁর নিজের সন্তানদের ক্ষতি করে। বরং, মা-ই সন্তানকে রক্ষা করেন, লালন-পালন করেন এবং সহায়তা করেন যাতে তাঁর সন্তানরা বিবর্তন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আরও সক্ষম হয়ে উঠতে পারে।

লাওৎসের ভাষায়, নিরাকার অথচ সম্পূর্ণ, যা স্বর্গ ও পৃথিবীরও পূর্বে বিদ্যমান। এটি নীরব, সীমাহীন; একক এবং অপরিবর্তনীয়। সর্বত্র বিস্তৃত অথচ অক্লান্ত। এটি স্বর্গের নীচে স্থিত সমস্ত কিছুর মা। আমি এর নাম জানি না তাই আমি এটিকে "তাও" বলি।"
 'তাও তে কিং' - লাওৎসে

কুণ্ডলিনী শক্তির রহস্যময় অভিজ্ঞতার কথা অনেক ভারতীয় সাধুসন্তরাও বর্ণনা করেছেন। যেমন আদি শঙ্করাচার্য (৭০০ খ্রিস্টাব্দ), কবির দাস (১৪০০ খ্রিস্টাব্দ), জ্ঞানদেব (১২০০ খ্রিস্টাব্দ) প্রমুখ।

কুণ্ডলিনী শক্তি সাধারণত সুপ্ত অবস্থায় থাকে। "আত্ম-সাক্ষাৎকার" লাভের লক্ষ্য হল এই শক্তিকে জাগ্রত করা, যাতে আমাদের ভিতর দৈবিক গুণাবলী প্রকাশ পায়। এটি আমাদের আত্মাকে জানতে চাওয়ার শুদ্ধ ইচ্ছা শক্তির দ্বারা জাগ্রত হতে পারে। আমাদের প্রকৃত সত্ত্বা প্রায়শই আমাদের নিজস্ব চিন্তাভাবনা এবং আবেগের দ্বারা ঢাকা পড়ে থাকে। কিন্তু যখন কুণ্ডলিনী জাগ্রত হয় তখন এটি স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমাদেরকে ধ্যানের অবস্থায় নিয়ে আসে এবং আমরা চিন্তাশূন‍্য হয়ে যাই। এই স্থিতিতে আমাদের সমগ্র সত্ত্বা আত্মার আলোকে আলোকিত হয়ে ওঠে। তখন আমরা চিন্তা ও আবেগ থেকে নিজেকে আলাদা করতে পারি এবং অনুভব করতে পারি সেই নির্মল আনন্দ ও শান্তিকে, যা সতত আমাদের সকলের অন্তরে বিরাজমান থাকে।

"বস্তুবাদ থেকে সরে এসে... আমি মনের আকাশে প্রবেশ করেছি, এবং দশম দ্বার খুলেছি। কুণ্ডলীকৃত কুণ্ডলিনী শক্তির চক্রগুলি খোলা হয়েছে, এবং আমি আমার সার্বভৌম ভগবানের সাথে নির্ভয়ে দেখা করেছি"
সন্ত কবির দাস

কুণ্ডলিনী শক্তির প্রভাব সূক্ষ্ম দেহ যন্ত্রে অনুভব করা যেতে পারে, যা শারীরিক স্তরে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র হিসাবে বিবেচিত হয়। যখন কুণ্ডলিনী উত্থিত হয়, তখন এটি আমাদের মেরুদণ্ড বরাবর স্থিত চক্রগুলির মধ্য দিয়ে যায়, যেটাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় প্লেক্সাস বলে। শ্রী মাতাজী আরোও ব্যাখ্যা করে বলেছেন যে, আমাদের কুণ্ডলিনীকে একগুচ্ছ লম্বা সূতো বা রশ্মির সমাহার হিসাবে কল্পনা করা যেতে পারে। যখন আমরা প্রথম আমাদের "আত্ম-সাক্ষাৎকার" লাভ করি তখন এর মধ্যে মাত্র একটি বা দুটি রশ্মি চক্রগুলির মধ‍্য দিয়ে উঠে এসে ব্রহ্মতালুকে ভেদ করে। প্রতিদিনের ধ্যানের ফলে, কুণ্ডলিনী শক্তির প্রভাব আরও শক্তিশালী হয় এবং ধ্যানের অভিজ্ঞতার সঙ্গে আমাদের সংযোগকে দৃঢ় করে, যা আরও গভীর, অন্তর্নিহিত এবং সুখকর হয়।

 

এখন প্রশ্ন হল, কীভাবে আপনি আপনার মন থেকে চিন্তা দূর করবেন। চিন্তা তো সবসময়ই আমাদের মনে চলতে থাকে… কিন্তু যখন কুণ্ডলিনী জাগ্রত হয়, তখন যা ঘটে তা হলো—এই চিন্তাগুলি দীর্ঘায়িত হয়ে যায়… এবং চিন্তাগুলির মাঝখানে একটি বিলম্ব সৃষ্টি হয় এবং এই বিলম্বই আমাদের শান্তির স্থান।
তুমি যদি এই শান্তি লাভ করতে পারো, তবে বিশ্বশান্তিও লাভ করা যেতে পারে। শুধুমাত্র প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে বা শান্তির জন্য চিৎকার করে কখনও প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় না। মানুষের অন্তর থেকেই শান্তি আসতে হবে।
মানুষের অন্তরে শান্তি তখনই প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, যখন তার হৃদয়ে আত্মার প্রকাশ ঘটবে, যেখানে এই শান্তির পরম আনন্দ প্রতিফলিত হবে। যখন তুমি সেই শান্তির আনন্দ উপভোগ করতে শুরু করবেন, তখন তুমি আর যুদ্ধ চাইবে না, তুমি কোনো যুদ্ধের কথা ভাববে না।
এই অবস্থাতেই এখন মানবজাতিকে উন্নীত হতে এবং পৌঁছাতে হবে।