সহস্রার চক্র

সহস্রার চক্র

একাকারিতা

সহস্রার চক্র আমাদের মস্তিষ্কের উপরের অংশে অবস্থিত এবং এটি আমাদের বিবর্তনের চূড়ান্ত পরিণতি নির্দেশ করে। মানুষ পৃথিবীতে জীবনের ৪.৮ বিলিয়ন বছরের শেষে আবির্ভূত হয়েছে। এই মনুষ্য প্রজাতি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধার কারণে পুরো গ্রহে আধিপত্য বিস্তার করেছে—সেটি হল আমাদের মস্তিষ্ক। তাহলে, আমাদের মানবজীবনের উদ্দেশ্য কী? এটা কি শুধু মস্তিষ্ক ব্যবহার করে কল্পিত ক্ষমতা বা অর্থ লাভের জন্য, না কি শুধুই সৃষ্টি, বিবর্তন ও মৃত বস্তু ধ্বংসের রহস্য অনুধাবনের জন্য আমাদের সীমিত বৈজ্ঞানিক কৌতূহল মেটানোর চেষ্টা? নাকি এর চেয়েও উচ্চতর কোনো উদ্দেশ্য আছে আমাদের মানবজীবনের, যা কেবল অল্প কিছু মানুষই উপলব্ধি করতে পেরেছেন?

আমাদের আত্মসাক্ষাৎকার, কুণ্ডলিনী শক্তির মাধ্যমে আমাদের ব্রহ্মরন্ধ্রের ভেদন ঘটে সংঘটিত হয়। তখন আমাদের মানবচেতনা, সচেতনতার এক নতুন রাজ্যে প্রবেশ করে—যা আমাদের মানসিক কর্মকাণ্ড ও চিন্তার গণ্ডির বাইরে। এই চক্র আমাদের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে বাস্তবতার প্রত‍্যক্ষ ও নিখুঁত উপলব্ধি প্রদান করে এবং আমরা সহজেই এক নির্বিকল্প চেতনার অবস্থায় প্রতিষ্ঠিত হই, যাকে বলা হয় নির্বিকল্প সমাধি।

সহস্রার চক্রের প্রাথমিক গুণ হল একীকরণ এবং মহাবিশ্বের সমস্ত উপাদানের সাথে একাকারিতার অনুভূতি। সহস্রারের মাধ্যমেই আমরা সর্বব্যাপী পরিব্যাপ্ত আধ্যাত্মিক শক্তি, পরম সত্যের সাথে সংযোগ অনুভব করি। সহস্রার আমাদের চূড়ান্ত গন্তব্যস্থলকে প্রতিফলিত করে। আমাদের জীবনের প্রকৃত অর্থ ও উদ্দেশ্য পুরোপুরি অনুধাবন করতে হলে, আমাদের সেই উচ্চতর চেতনার জগৎকে অন্বেষণ করতে হবে, যা সেই মহাশক্তির অংশ, যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন।

সপ্তম চক্রটি হাজার হাজার নাড়ী এবং চক্রকে সমন্বিত করে সমগ্র সূক্ষ্ম ব্যবস্থার ক্ষমতা ও গুণাবলীকে একীভূত করে। প্রতিটি চক্রের কার্যপদ্ধতি সহস্রারের মধ্যে অবস্থিত তাদের নিজ নিজ কেন্দ্রের মাধ্যমে সক্রিয় হয়। যেভাবে মস্তিষ্ক আমাদের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে—যেখানে সমস্ত তথ্য এই সুপার কম্পিউটারের মাধ্যমে আদান-প্রদান ও বিশ্লেষণ করা হয়—ঠিক তেমনভাবেই সহস্রার পুরো সূক্ষ্ম ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা ও কার্যসম্পাদন করে।

শ্রী মাতাজীর আঁকা চিত্র
শ্রী মাতাজীর আঁকা চিত্র

অবস্থান:
আপনার সহস্রার চক্রটি আপনার মস্তিষ্কের লিম্বিক অংশে অবস্থিত।আপনি আপনার হাতের তালুর কেন্দ্রে সহস্রার চক্রের স্পন্দন অনুভব করতে পারেন।

গুণাবলী:
সহস্রার চক্রের মাধ্যমে আপনি সেই সৃষ্টিশক্তির সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারেন, যিনি আপনাকে সৃষ্টি করেছেন। এর মাধ্যমে আপনি আপনার জীবনের অর্থ আবিষ্কার করতে পারেন।
এটি আপনার চূড়ান্ত গন্তব্যকে নির্দেশ করে—পৃথিবীতেই স্বর্গের অনুভূতির উপলব্ধি, অর্থাৎ স্বর্গের বাস্তবায়ন।

সহস্রার চক্রের গুণাবলীর মধ্যে রয়েছে:

• সৃষ্টির সঙ্গে “একাত্ববোধ” (এটি "একীকরণ" নামেও পরিচিত)
• নির্বিচার চেতনা বা মানসিক নীরবতা
• নির্বিকল্প চেতনা বা ঐশ্বরিক শক্তির সচেতন উপলব্ধি

Chakra Charts_BN_Page_09_Image_0001

আপনার ছয়টি প্রধান চক্র—মূলাধার চক্র থেকে শুরু করে আজ্ঞা চক্র পর্যন্ত—প্রতিটিরই মূল বা শিকড় আপনার মস্তিষ্কের ভিতরে বিদ্যমান।যখন আপনি সহজ যোগ অনুশীলন করেন, তখন কুণ্ডলিনী শক্তি জাগ্রত হয় এবং উপরে উঠতে শুরু করে। এটি একে একে ছয়টি চক্র অতিক্রম করে এবং অবশেষে মস্তিষ্কের লিম্বিক অঞ্চলে স্থিত হয়।এই প্রক্রিয়াটিকে বলা হয় আত্মসাক্ষাৎকার।

সহস্রার চক্র লিম্বিক অঞ্চলের একটি ফাঁপা (শূন্য) স্থানের মধ্যে অবস্থিত। এই স্থানকে ঘিরে রয়েছে এক হাজার স্নায়ু।যখন ধ্যানের মাধ্যমে কুণ্ডলিনী শক্তি আপনার সহস্রার চক্রে প্রবেশ করে, তখন এই সব স্নায়ু একসঙ্গে সক্রিয় হয়ে ওঠে।এরপর, কুণ্ডলিনী শক্তি আপনার ব্রহ্মরন্ধ্র দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে এবং মহাবিশ্বের ঐশ্বরিক শক্তির সাথে একত্রিত হয়।

অভিজ্ঞতা এবং সুবিধা:
যখন কুণ্ডলিনী শক্তি আপনার মস্তিষ্কের শীর্ষভাগ ভেদ করে উঠে যায়, তখন এটি ব্যক্তিগত চেতনা (মানবিক চেতনা)-কে সার্বজনীন চেতনার (দিব্য চেতনার) সঙ্গে একত্রিত করে।একে আপনি মাথার শীর্ষে একটি শক্তিশালী স্পন্দনের অনুভূতি হিসাবে অনুভব করতে পারেন।
এই শক্তিশালী স্পন্দনের পরে প্রায়ই দ্রবীভূত হয়ে যাওয়ার মতো অনুভূতি এবং শীতল স্পন্দন অনুভূত হয়। এই অভিজ্ঞতার ফলস্বরূপ, আপনি সচেতনতার একটি নতুন মাত্রা পাবেন যা আপনাকে সত্যকে আরও ভালভাবে উপলব্ধি করার সামর্থ্য দেবে। ভালো থেকে খারাপ, সঠিক থেকে ভুল এবং সত্য থেকে মিথ্যার পার্থক্য করার জন্য যা দরকার তা আপনি লাভ করবেন।

একবার আপনি কুণ্ডলিনী শক্তির সাথে সর্বব্যাপী দৈব শক্তির সঙ্গে যোগসূত্র লাভ করলে, তখন আর অতীত বা ভবিষ্যত (চিন্তা) দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে থাকবেন না। আপনি প্রকৃত আত্মিক আনন্দ অনুভব করবেন যা পূর্বে কখনও অনুভব করেননি। এই পর্যায়ে আপনার মানবচেতনা ঈশ্বর (চেতনা) এর সঙ্গে এক হয়ে যায়, এবং আপনি শারীরিক, বৌদ্ধিক, আবেগময় ও আধ্যাত্মিক সত্ত্বাগুলোর সাথে এক হয়ে যান।

তখন আপনি সম্পূর্ণ সঙ্গতির সঙ্গে কাজ করতে পারবেন। আপনার মধ্যে আর বিভ্রান্তি বা দ্বন্দ্ব থাকবে না। আপনি অনুভব করবেন সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রশান্তি এবং নির্বিচল আনন্দ।
আপনি স্বতঃসিদ্ধভাবে বুঝতে পারবেন কোন প্রতিক্রিয়া বা কাজটি নৈতিকভাবে সঠিক কিনা। কুণ্ডলিনীর সংযোগ লাভের আগে, আপনাকে হয়তো শুধু বিশ্বাসের ভিত্তিতে ঈশ্বরের অস্তিত্ব মেনে নিতে হতো। কিন্তু সংযোগ লাভের পরে আপনি প্রবেশ করবেন এক নির্বিকল্প চেতনার অবস্থায়, যেখানে আপনি শুধু ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতনই হবেন না, বরং তা নিয়ে অটল ও নিশ্চিত থাকবেন। আপনি যত ধ্যান করবেন, এই নির্বিকল্প চেতনা ততই গভীর ও দৃঢ় হয়ে উঠবে।

স্ব-মূল্যায়ন:
যদি আপনার সহস্রার চক্র অবরুদ্ধ বা ভারসাম্যহীন থাকে, তাহলে আপনি সাধারণভাবে স্পন্দন অনুভব করতে অসুবিধা অনুভব করতে পারেন।
এছাড়াও, আপনার মধ্যে ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে সন্দেহ জাগতে পারে। সৌভাগ্যবশত, আপনি যত বেশি সহজ যোগের ধ্যান অনুশীলন করবেন, আপনার সব চক্র (শক্তিকেন্দ্র) ততই পরিষ্কার এবং জাগ্রত হবে। এর ফলে ধীরে ধীরে সহস্রার চক্রে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে।
এ জন্য যা প্রয়োজন, তা হলো একটি উন্মুক্ত মন এবং ধ্যানের অভ্যাস চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা। শেষ পর্যন্ত, আপনি নিয়মিতভাবে আপনার কুণ্ডলিনীর দৈব শক্তির সঙ্গে সংযোগের অভিজ্ঞতা লাভ করবেন এবং তা স্থায়ীভাবে উপলব্ধি করতে পারবেন।

ভারসাম্যহীনতার কারণ:

• আত্মবিশ্বাসের অভাব
• নাস্তিকতার চরম রূপ
• বিভৎস পরিবেশে থাকা

কিভাবে ভারসাম্যে আনবেন:

আপনি আপনার সহস্রার চক্রকে ভারসাম্যপূর্ণ করার জন্য একটি সহজ উপায় অনুশীলন করতে পারেন—
আপনার ডান হাতটি দৃঢ়ভাবে মাথার তালুর ওপর রাখুন এবং ধীরে ধীরে ঘড়ির কাঁটার দিকে ঘোরান।

এই সময় বলুন:
“আমাকে ধ্যানের অবস্থার অভিজ্ঞতা দিন।”

যদি আপনি শুরুতে স্পন্দন অনুভব করতে না পারেন, তাহলে সেটিকে সন্দেহের কারণ হিসেবে দেখবেন না।
অনেক সহজ যোগ অনুশীলনকারী-ই অনুভূতি লাভে কিছুটা সময় নিয়ে থাকেন,
তারা ধীরে ধীরে স্পন্দন অনুভব করতে শেখেন অথবা কুণ্ডলিনী শক্তির সংযোগ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেন। ধৈর্য ধরুন এবং নিয়মিত অনুশীলন চালিয়ে যান। আপনি অবশ্যই সেই অভিজ্ঞতায় পৌঁছাতে পারবেন। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ যা সহস্রার চক্রকে খোলা ও বাধামুক্ত রাখতে সাহায্য করে।