শ্রী মাতাজী সাধকদের ব্যাখ্যা করেছিলেন যে কীভাবে শরীরের ভিতরে বা হাত-পায়ের আঙুলের ডগার মতো অঙ্গপ্রান্তেও সূক্ষ্ম কেন্দ্রগুলো (চক্র) প্রকৃতপক্ষে অনুভব করা যায়। তিনি আরোও বলেছেন যে, আমাদের মানব মনের অবস্থার ওপর নির্ভর করে বিভিন্ন ধরনের অনুভূতি—উষ্ণ, শীতল, কিংবা শারীরিক ঝিনঝিনে ভাব বা ভারীভাব—অনুভূত হতে পারে। তাঁর উপস্থিতিতে সাধকরা যে অনুভূতিগুলো পেতেন, তিনি ধৈর্য্যসহকারে প্রত্যেকটির ব্যাখ্যা দিতেন এবং দেখাতেন সেগুলো আমাদের শরীর, মন, আবেগ এবং আত্মিক স্তরে কোন্ কোন্ নির্দিষ্ট সমস্যার ইঙ্গিত বহন করছে। তিনি আরও উল্লেখ করেছিলেন যে, এই আত্মিক অভিজ্ঞতার অত্যন্ত সুন্দর বর্ণনা বিশ্বের বহু শাস্ত্রে রয়েছে, যেমন পবিত্র কোরানের আয়াতগুলোতেও আছে।
চক্রগুলিকে আগুনের শিখার মতো বা পদ্মফুলের পাপড়ির একটি বান্ডিল হিসাবে কল্পনা করা যেতে পারে। প্রতিটি চক্রে ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যক পাপড়ি থাকে, যা স্নায়ু-জালকের ভেতরে থাকা উপ-জালকগুলোর সংখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই স্নায়ু-জালকগুলি আমাদের দেহ ও মস্তিষ্কের ভেতরে তথ্যের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে, যা আমাদের সত্ত্বার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে সমস্ত কার্যকারিতা নিশ্চিত করে। এগুলোই আমাদের সমস্ত শারীরিক, মানসিক এবং আবেগগত ক্রিয়াকলাপের মূল উৎস। তাই প্রতিটি চক্র নির্দিষ্ট কিছু শারীরিক, মানসিক ও আবেগগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। যখন আমরা মানসিক, আবেগগত অথবা শারীরিক স্তরে কোনো অসামঞ্জস্য বা ব্যাধি অনুভব করি তখন তা এই চক্রগুলোরই মধ্যে কোনোও না কোনো সূক্ষ্ম প্রতিবন্ধকতা বা বাধার কারণে হয়।
আমাদের স্নায়ুতন্ত্রের প্রান্তীয় বিস্তার আমাদের সূক্ষ্ম দেহের প্রান্তিক প্রসারণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যার ফলস্বরূপ মেরুদণ্ডের ভেতরে অবস্থিত চক্রগুলোর সঙ্গে আমাদের হাত ও পায়ের সংশ্লিষ্ট প্রান্তবিন্দুগুলোর সরাসরি সম্পর্ক স্থাপিত হয়। যদি কেউ আমাদের শরীরে থাকা বিভিন্ন চক্রের অবস্থান এবং তাদের সম্পর্কিত সঠিক সাংকেতিক ভাষা উদ্ধার করতে পারেন, তবে তিনি সহজেই নিজের শারীরিক, মানসিক, আবেগগত ও আধ্যাত্মিক সত্ত্বার উপর দক্ষতা অর্জন করতে পারবেন। একজন ব্যক্তি তখন আর তার পরম সার্বজনীন বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকেন না, বরং আত্মজ্ঞান লাভের মাধ্যমে উপলব্ধ বাস্তবতার ভ্রম থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতে সক্ষম হন।
আমাদের সূক্ষ্ম তন্ত্রের কেন্দ্রগুলো শুধু আমাদের শারীরিক, মানসিক ও আবেগগত সুস্থতাই নিয়ন্ত্রণ করে না, বরং আমাদের ব্যক্তিত্ব গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমরা যখন বিকশিত হই, পরিপক্ক হই এবং বৃদ্ধি পাই তখন এইসব ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্যগুলি আমাদের জীবনে প্রকাশ পায়, কখনও কখনও সচেতনভাবে বা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অচেতনভাবে। ভাবুন তো, কতবার কোনোও পরিস্থিতিতে আপনি হঠাৎ কাউকে সাহায্য করতে, সদয় হতে বা কারোও প্রতি উদার হওয়ার তাড়না অনুভব করেছেন। এই অনুভূতিগুলো কোথা থেকে আসে? প্রাচীন প্রাচ্য সংস্কৃতি— মূলতঃ চীন ও ভারতে—যারা সূক্ষ্ম তন্ত্রের জ্ঞান অনুসরণ করে জীবনযাপন করত, তারা তাদের সমাজব্যবস্থা আধ্যাত্মিক জীবনের উচ্চতর মূল্যবোধের উপর প্রতিষ্ঠা করেছিল, অর্থাৎ ধর্মের উপর। প্রাচীন সংস্কৃত ভাষায় ‘ধর্ম’ শব্দের অর্থ হলো ‘ন্যায়নিষ্ঠ আচরণবিধি’—একটি আচরণবিধি যা সর্বজনীন চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর একটি সমান্তরাল উপমা টানা যেতে পারে মোসেস এর প্রতি অর্পিত দশ আদেশের সঙ্গে। প্রকৃতপক্ষে, প্রাচীন বিশ্বের অনেক ধর্ম, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যে এই সর্বজনীন অভ্যন্তরীণ আচরণবিধির নানান উদাহরণ পাওয়া যায়।
শ্রী মাতাজী প্রদত্ত জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে নিম্নলিখিত বিভাগগুলিতে প্রতিটি চক্রের বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হয়েছে এবং সূক্ষ্ম কেন্দ্রগুলোর মৌলিক নীতির উপর ভিত্তি করে তাদের মধ্যে অন্তর্নিহিত জ্ঞানের বৈশিষ্ট্যগুলো তুলে ধরা হয়েছে। এই কেন্দ্রগুলির কিছু গুণাবলী আমাদের জন্মের সময় থেকেই আমাদের মানব সচেতনতায় প্রকাশিত হয়। তবে কুণ্ডলিনী জাগরণের মাধ্যমে আমাদের আত্ম-সাক্ষাৎকারের পরে এই কেন্দ্রগুলির উচ্চতর সূক্ষ্ম গুণাবলী সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ পায়।
বিভিন্ন শক্তি-কেন্দ্রের এই সূক্ষ্ম জ্ঞান ব্যবহার করে, আমরা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বসবাস করতে পারি এবং তাদের সাহায্য করতে পারি।